Thursday, July 12, 2018

বাল্যবিবাহ


আরমান খান::
বাংলাদেশের সমাজ ব্যবস্থায় বাল্যবিবাহ একটি অন্যতম সমস্যা। রাঙামাটির লংগদু উপজেলায়ও বাল্যবিবাহের খবর মাঝে-মধ্যেই শোনা যায়। পাহাড়ি জনগোষ্ঠির তুলনায় বাঙালিদের মধ্যে এ হার আশঙ্কাজনক। প্রশাসনের নিয়মিত অভিযান পরিচালনার কারণে অনেক ক্ষেত্রে গোপনেই এসকল বিয়ের আয়োজন করা হয়।

জীবনের জয়গান: ২০১০ সালের মার্চ মাস। লংগদু বালিকা বিদ্যালয়ের সপ্তম শ্রেণির ছাত্রী শেফালী (ছদ্ম নাম)। পরিবারের আর্থিক অভাব-অনটনের পাশাপাশি প্রতিবেশী কলেজ পড়ুয়া যুবকের সাথে প্রেমের সর্ম্পক থাকার কারণে
বাবা-মা এবং বড় চাচা মেয়ের বিয়ে ঠিক করেন এক আত্মীয়ের সঙ্গে। ছেলেটির বয়সও কম। মেয়েটি তার সহপাঠীদের মাধ্যমে বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষককে বিয়ের কথা  জানায়। প্রধান শিক্ষক সহকারী শিক্ষকদের সাথে নিয়ে মেয়েটির বাড়িতে যান। শেফালীর বাবা-মা ও চাচাকে বাল্যবিবাহের কুফল এবং আইন সম্পর্কে বোঝানোর চেষ্টা করেন। তাদের বোঝাতে ব্যর্থ হয়ে ফিরে আসেন উপজেলা নির্বাহী অফিসারের কাছে। শেষ পর্যন্ত উনার হস্তক্ষেপে বিয়েটি বন্ধ হয়।

বর্তমানে শেফালী স্থানীয় কলেজে উচ্চ মাধ্যমিকের ছাত্রী। এ বিষয়ে জানতে চাইলে শেফালী বলেন, আমার কিছু ভুলের কারণে পরিবার আমাকে নিয়ে নিরাপত্তাহীনতায় ছিলো। যার কারণে আমাকে বিয়ে দিতে চেয়েছিলো। আমি আমার ভুলগুলো শুধরে নিয়েছি। আমার পরিবার আর কখনো আমাকে বিয়ে দেয়ার চেষ্টা করেনি। নানা সমস্যার মাঝেও আমি পড়ালেখা চালিয়ে যাচ্ছি। এখন স্বপ্ন দেখি, পড়ালেখা শেষ করে শিক্ষকতা করব। পরিবারকে আর্থিকভাবে সচ্ছল করতে সহযোগিতা করব।

আত্মপ্রত্যয়ী নারী: সহায়-সম্বলহীন পরিবারে জন্ম নুরজাহান (ছদ্ম নাম) নামের মেয়েটির। ছোটবেলা থেকে ভালো খাবার বা ভালো পোশাক খুব একটা জোটেনি। বয়স যখন আট তখন থেকে মানুষের বাড়িতে গৃহকর্মীর কাজে লাগিয়ে দেন বাবা-মা। কখনো ঢাকা, কখনো চট্টগ্রাম, এভাবেই কেটেছে পাঁচটি বছর। নুরজাহানের বয়স যখন ১৩ তখন প্রতিবেশী যুবক সুলতানের সাথে বিয়ে দেন বাবা-মা। সুলতান পেশায় জেলে। আয়-রোজগার যা করেন ভালোই চলে তাদের। কিন্তু বিয়ের ছয় মাস পরেই শুরু হয় নানা রকম নির্যাতন। নির্যাতন সইতে না পেরে একদিন বিষ পান করে নুরজাহান। তবে সে যাত্রায় বেঁচে যায় মেয়েটি। সামাজিক সালিশ-বৈঠকের মাধ্যমে আবারো সংসার শুরু করেন নুরজাহান-সুলতান দম্পতি। বিয়ের দেড় বছর পর পুত্র সন্তানের মা হন নুরজাহান। ছেলে হওয়ার দু’মাস পরে আবারও নির্যাতন শুরু হয়। অতিষ্ঠ হয়ে এবার নুরজাহান তালাক দেন সুলতানকে। ছেলেকে নিয়ে গরিব বাবা-মায়ের কাছে আশ্রয় নেন। ছয় মাস পর শিশু সন্তানকে রেখে চট্টগ্রমে পোশাক কারখানায় চাকরিতে চলে যান। এখন ভালোই রোজগার করেন, ছেলেকে ভরণ-পোষণ দেন, পাশাপাশি বাবা-মাকেও সহযোগিতা করেন।

শেষ পরিণতি: স্থানীয় একটি দৈনিকে ২০১৬ সালের ৩১ জুলাই প্রকাশিত ‘লংগদুতে গৃহবধুর আত্মহত্যা’ শিরোনামের খবর থেকে জানাযায়, জেসমিন আক্তার(২০) লংগদু উপজেলার দক্ষিণ মারিশ্যারচর গ্রামের কালু মিয়ার মেয়ে। কালু মিয়া পেশায় একজ কৃষক। চার সন্তানের মধ্যে জেসমিন সবার বড়। ১৫ বছর বয়সে একই গ্রামের যুবক আসর আলীর সাথে বিয়ে হয় জেসমিন আক্তারের। বেকার আসর আলী যৌতুকের জন্য জেসমিনকে মাঝেমধ্যেই নির্যাতন করত। অন্য নারীর প্রতি আসক্তির অভিযোগে গ্রামে সালিশও হয়েছে একাধিকবার। কোনো কিছুতেই পরিবর্তন হয়নি আসর আলীর। তিন বছর পরে জেসমিনের কোলে আসে পুত্রসন্তান মুহাম্মদ ইয়াছিন। এরপর থেকে স্বামী-সন্তানসহ কৃষক বাবার পরিবারেই থাকেন জেসমিন।

ঘটনার দিন দুপুরে গ্রামে বিয়ের অনুষ্ঠানে গিয়েছিলেন আসর আলী ও জেসমিন। সেখানে আসর আলী অন্য নারীর সাথে আপত্তিকর আচরণ করলে জেসমিন রাগ করে বাড়িতে ফিরে আসেন। এ সময় জেসমিনের বাবা-মা কৃষি কাজের প্রয়োজনে অন্যত্র ছিলেন। সন্ধ্যায় আসর আলী বাড়িতে আসার পর স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে ঝগড়া শুরু হয়। এক পর্যায়ে আসর আলী শিশু পুত্রকে নিয়ে বাড়ি থেকে বেরিয়ে পড়লে জেসমিন ঘরে থাকা ফসলের জন্য রাখা বিষ পান করে। জেসমিনকে লংগদু স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে আনা হয় রাত এগারোটায়। চিকিৎসাধীন অবস্থায় ভোর চারটায় মারা যান জেসমিন।

অহরহ ঘটছে এমন ঘটনা। মিডিয়ার বদলৌতে কিছু ঘটনা মানুষ জানতে পারলেও বেশিরভাগই আড়ালে থেকে যায়। বাল্যবিবাহের ক্ষতি সম্পর্কে মানুষের মাঝে ব্যাপক সচেতনতা তৈরি করা, জনপ্রতিনিধিদের সহযোগিতা, প্রশাসনের নিয়মিত অভিযান পরিচালনা হলে এ সামাজিকব্যধি থেকে পরিত্রাণ পাওয়া সম্ভব। বাল্যবিবাহ প্রতিরোধে এখন সময় এসেছে আইনের সুষ্ঠু প্রয়োগ ও সামাজিক প্রতিরোধ গড়ে তোলার। তা নাহলে পিছিয়ে পড়বে আগামী প্রজন্ম।

আরমান খান : সংবাদকর্মী।

No comments:

Post a Comment