Wednesday, July 11, 2018

হ্রদের বুকে বিশাল বিল


জিয়াউল হক::

দক্ষিণ এশিয়ার বৃহত্তম কাপ্তাই হ্রদের বুকে বিশাল এলাকা জুড়ে রয়েছে এক বিল। বিশাল এই বিলের যেদিকেই চোখ যায় শুধু পানি আর পানি। দশ কিলোমিটার দৈর্ঘ্য ও দশ কিলোমিটার প্রশস্ত এই বিলের মাঝখানে রয়েছে ছোট্ট একটি দ্বীপ। আর দ্বীপেই গড়ে উঠেছে বসতি ও বাজার। রাঙ্গামাটি জেলার মানুষের কাছে কাট্টলি বাজার নামেই পরিচিত এটি। আর বিশাল বিলটিও পরিচিত কাট্টলি বিল নামে।

বিশাল জলরাশির মধ্যভাগে জেগে আছে ছোট ছোট সবুজ দ্বীপ।
ছোট ছোট ডিঙি নৌকা ছুটে চলছে জলের বুকে। একটু দূর দিয়েই যাচ্ছে যাত্রীবোঝাই দু’তলা কাঠের লঞ্চ। ৭২৫ বর্গকিলোমিটারের কাপ্তাই হ্রদ ছড়িয়ে আছে পাহাড়ের ফাঁকে ফাঁকে। হ্রদের বুক চিরে জলযোগে যাওয়া যায় রাঙ্গামাটির সর্বপ্রান্তে। কাপ্তাই লেকের সবচেয়ে বেশি মাছ ধরা পড়ে লংগদু-কাট্টলি অংশে। সারা রাত ধরে ছোট ডিঙি নৌকা নিয়ে জেলেরা মাছ ধরে। সকালে ঘাটে বহু রকমের মাছের পসরা নিয়ে বসে জেলেরা। পাবদা, রুই, চিতল, বোয়াল, শিং, মাগুর, চাপিলাসহ বহু রকমের তাজা মাছের সমাহার, দামেও বেশ সস্তা।

বিশাল জলরাশির বুকে আর নীল আকাশের নিচে নিঃশব্দেই জেগে আছে কাট্টলি বিলের অনেকগুলো দ্বীপ। কাপ্তাই লেকের বিস্তৃত জলরাশির মাঝখানে এই দ্বীপগুলোতে গড়ে উঠেছে মানুষের বসতি। মাছ শিকারকে কেন্দ্র করে দ্বীপের বুকে গড়ে উঠেছে বাজার। জেলেদের নৌকা মেরামতের সরঞ্জামের দোকান আর শুঁটকিপল্লী গড়ে উঠেছে এই বাজারে। 

বাঘাইছড়ি-মাইনী এবং লংগদু অঞ্চলের সঙ্গে রাঙ্গামাটির যোগাযোগের প্রধান মাধ্যম হলো পাকিস্তান আমলের কাঠের তৈরি দু’তলা লঞ্চগুলো। লংগদু থেকে কাট্টলি দ্বীপের বাজারে পৌঁছতে লঞ্চে সময় লাগে একঘণ্টার কিছু বেশি। আর রাঙ্গামাটি সদর থেকে পানিপথে কাট্টলি বিলের দূরত্ব প্রায় আড়াই ঘণ্টা। একমাত্র বাহন লঞ্চ বা দেশিবোট।

অন্যদিকে, মটরবাইকে রওনা দিলে খাগড়াছড়ির দিঘীনালা থেকে আঁকাবাঁকা সরু পাহাড়ি পথ পেরিয়ে একঘণ্টায় পৌঁছোনো যায় লংগদু বাজারে। রাঙ্গামাটির পুরানো বাজারগুলোর মধ্যে অন্যতম লংগদু বাজার। পাশেই মাইনীমুখ, যেখানে মাইনী নদী এসে মিশেছে কাচালংয়ের বুকে। মাইনী নদীর মুখে গড়ে ওঠা মাইনী বাজার এই অঞ্চলের পুরানো এবং প্রধান বাজার।

মাইনীমুখ পেরিয়ে রাঙামাটির দিকে যেতে সুমদ্রের মতোই বিশাল জলরাশির বুকে দ্বীপের মতো কাট্টলি বাজার। লেকের এই অংশজুড়ে দেখা মেলে সারি সারি মাছধরা নৌকার। মনকাড়ে এখানকার পানকৌড়ির জলকেলি আর নানান পাখির ঝাঁক। রাঙ্গামাটি জেলায় শীতের পাখি দেখার জন্য আদর্শ জায়গা এই কাট্টলি বিল। এখানে শীতের শুরু থেকেই অতিথি পাখিরা দলবেঁধে ঘুরে বেড়ায়। হাজারো অতিথি পাখির ডাকাডাকি আর মাতামাতিতে মুখরিত থাকে চারপাশ। মাছের প্রাচুর্যের কারণে কাট্টলি বিল পাখিদের কাছে বেশ প্রিয়। ছোট সরালি, টিকি হাঁস, বড় সরালি, মাথা মোটা টিটি, গাঙচিল, গাং কবুতর, চ্যাগা, চখাচখিসহ নানান প্রজাতির পাখির ঝাঁকে মুখরিত পুরো বিল।

কাট্টলি বিলের সৌন্দর্য দেখতে গিয়েছিলাম ১২ জনের একটি দল। দেশিবোটে করে রওনা হয়েছিলাম লংগদু ঘাট থেকে। নীল জলরাশির বুক চিরে ঢেউ তুলে চলেছে ইঞ্জিনচালিত বোট। চারপাশে পানি আর পানি, আর সবই যেন গেছে ভেসে, মাঝপথে শুধু ছোট ছোট দ্বীপ আর দূরে পাহাড়ের সারি।

হ্রদের মাঝখানের এই দ্বীপগুলোতে মাত্র দু’একটি পরিবারের বসবাস। বর্ষায় এসব দ্বীপ পানির নিচে থাকে। প্রত্যেক পরিবারের যোগাযোগের জন্য একটা করে নৌকা আছে। জলের জীবন দেখতে দেখতে চলেছি কাট্টলি বিলের দিকে। দেখি দূরের পাহাড়গুলোকে চুম বুলিয়ে নীল মেঘ অবারিত জলরাশিকে নিজের রঙে রাঙিয়ে দিয়ে ভেসে বেড়ায়। দেখতে দেখতে দুপুর নাগাদ পৌঁছে যাই কাট্টলি বিলে। লেকের নীলাভ স্বচ্ছ জলে দীর্ঘ স্নান শেষে নানা পদের তাজা মাছ দিয়ে মধ্যাহ্ন ভোজ সারলাম বাজারের শাহজাহান ভাইয়ের দোকানে। পরিতৃপ্তির স্বাদ নিয়ে কাট্টলি বিল থেকে আবার যখন রওনা হলাম লংগদুর পথে ততক্ষণে সূর্য মামা সোনা রঙা আলোয় মুড়িয়ে মুখ লুকিয়েছে পাহাড়ের বুকে।

হ্রদের বুকে বিশাল বিল আর এর প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের কারণেই কাট্টলি বিলের আকর্ষণ অফুরন্ত। যা সৌন্দর্য পিপাসু মানুষকে টেনে আনে বারবার। কাট্টলি বিলের আকর্ষণকে কেন্দ্র করে এখানে অপার সম্ভাবনা আছে পর্যটনের। সেকারণেই কাট্টলি বিলে পর্যটন স্পট গড়ে তোলার পরিকল্পনা হাতে নিয়েছে রাঙ্গামাটি জেলা পরিষদ। আশা করা যায়, জেলা পরিষদের পরিকল্পনা বাস্তবায়ন হলে দেশ-বিদেশের সৌন্দর্য পিপাসু মানুষের কাছে এই কাট্টলি বিল হবে নতুন গন্তব্য। ফলে গতি আসবে এখানকার অর্থনীতিতে। তবে স্থানীয়রাও যাতে অংশীদারিত্বের ভিত্তিতে সম্মানের সাথে সম্পৃক্ত থাকতে পারেন, নিশ্চিত করতে হবে সেটাও।

জিয়াউল হক: সাংবাদিক।

No comments:

Post a Comment