মো. আল আমীন::
জীবনের অনেক বাঁক থাকে। আর এসব বাঁকে পড়লে আমাদের মনে হয় পারব না, আমার দ্বারা হবে না, কেন আমার সাথে এমনটা হয়, হাজারো না-বোধক ভাবনা আসে। কিন্তু সকল না-কে জয় করে হ্যাঁতে রূপ দিতে পারাটাই হচ্ছে সফলতা। শত প্রতিকূল পরিস্থিতিতে থেকেও দৃঢ় ইচ্ছাশক্তি থাকলে সফলতা আসবেই। দারিদ্র্য, প্রতিকূল পরিবেশ সফলতার জন্য কোনো বাধা নয়।
পৃথিবীর প্রত্যেকটা মানুষেরই স্বপ্ন থাকে।
কারো স্বপ্ন বড় আবার কারো ছোট। আমার তেমন কোনো স্বপ্নই ছিল না। প্রাথমিক বিদ্যালয়ে লেখাপড়া শেষ করার পর মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে ভর্তি হই। ২০০৩ সালে মানবিক বিভাগে এসএসসি পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হই। এসএসসি শেষ করার পরেই শুরু হয় আমার জীবনের চরম প্রতিকূলতা। আমার উপজেলা লংগদুতে একটিমাত্র কলেজ, রাবেতা মডেল কলেজ। যা আমার বাড়ি থেকে ১২ কি.মি. দূরে অবস্থিত। বাবাকে যখন বললাম কলেজে ভর্তি হব, তিনি রাজি হলেন না। আমার বাবা একজন দর্জি, তার আয় খুবই সামান্য। তিনি বললেন, অনেক হয়েছে। এবার আমার সাথে কাজ শিখ্। কিন্তু আমার কলেজে পড়ার খুব ইচ্ছে। যাক শেষ পর্যন্ত আমার (বর্তমানে জান্নাতবাসী) মায়ের প্রচেষ্টায় কলেজে ভর্তি হলাম। এবার শুরু হলো জীবনের চরম পরীক্ষা। বাবার সাফ কথা, কোনো খরচ দিতে পারবেন না। বাধ্য হয়ে এক বাড়িতে লজিং থেকে টিউশনি করে ২০০৫ সালে এইচএসসিও শেষ করলাম।
এবার উচ্চ শিক্ষার জন্য তো যেতে হবে সেই সুদূর চট্টগ্রামে। মনে হলো, এখানেই শেষ। মাকে বললাম, এবার কী হবে? মা নিজের জমানো শেষ সম্বলটুকু দিয়ে এক বড় ভাইয়ের সাথে চট্টগ্রাম পাঠিয়ে দিলেন। চট্টগ্রাম এসে এক বস্তিতে থেকেছি ছয় মাস। জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় ছাড়া অন্যকোন বিশ্ববিদ্যালয়ের ফরম পর্যন্ত কিনতে পারিনি টাকার অভাবে। সরকারি হাজী মুহাম্মদ মুহসীন কলেজে ভর্তি পরীক্ষা দিয়ে অর্থনীতি বিভাগে স্নাতক (সম্মান) কোর্সে ভর্তি হই। আল্লাহর ইচ্ছায় এর মধ্যেই একটা লজিং পেয়ে যাই। শুরু হয় জীবনের অন্য অধ্যায়। লজিং, টিউশনি, নিজের প্রাইভেট- এভাবেই চলতে থাকে দিনগুলো।
তখনো আমি স্বপ্ন দেখিনি যে বিসিএস ক্যাডার হব। ভাবছি, ছোট একটা চাকরি পেলেই জীবনটা চলে যাবে। অনেক পরীক্ষা দেই, কিন্তু চাকরি হয় না। এরই মধ্যে টিউশনি করে বেশ কিছু টাকাও জমিয়েফেলি। চতুর্থ বর্ষে পড়ার সময় বিসিএস সম্পর্কে জানতে পারি, কিন্তু বিসিএস ক্যাডার যে হতে পারব তা কল্পনাও করিনি। যাহোক, অনার্স শেষ করে প্রথমবারের মতো ৩৪তম বিসিএস পরীক্ষ দিই। কিন্তু প্রিলিমিনারিতেই ফেল। হতাশায় পেয়ে বসল। কিন্তু ৩৪তম বিসিএস’র চূড়ান্ত ফল প্রকাশের পর দেখলাম, আমার সহপাঠী তিনজন ক্যাডার হয়েছে।
তখনই চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিলাম, ক্যাডার সার্ভিসেই চাকরি করব ইনশাল্লাহ।
শুরু হলো ৩৫তম বিসিএস-এর জন্য প্রস্তুতি। কখনো হিসাব করে পড়াশোনা করিনি। তবে যেহেতু বিসিএসকে চূড়ান্ত স্বপ্ন বানিয়েছিলাম তাই সর্বোচ্চ অধ্যাবসায় করেছি। এই অধ্যাবসায়ই আমাকে বাংলাদেশের চাকরির বাজারে প্রতিযোগিতা করার জন্য চূড়ান্তভাবে তৈরি করেছিল। ৩৫তম বিসিএস’র প্রিলিমিনারি পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হলাম এবং সবকিছু বাদ দিয়ে লিখিত পরীক্ষার জন্য প্রস্তুতি শুরু করলাম, মহান আল্লাহ এখানেও আমাকে উত্তীর্ণ করলেন। সবশেষে ভাইভা দিয়ে অপেক্ষার শুরু। এই বিসিএস পরীক্ষার জন্য আমি দু’বার ঈদে গ্রামের বাড়িতেও যাইনি। সকল অপেক্ষার অবসান ঘটিয়ে ২০১৬ সালের ১৭ আগস্ট ৩৫তম বিসিএস’র চূড়ান্ত ফল প্রকাশ করে পিএসসি; আমি বিসিএস শিক্ষা ক্যাডারে ২৪তম স্থান অধিকার করে উত্তীর্ণ হই। যখন ক্যাডার হয়েছি এটা জানতে পারি তখন আমার বিশ্বাস হয়নি, মনে হয়েছিল কল্পনা বা ঘুমের ঘোরে স্বপ্ন দেখছি। যাহোক সেটা শেষ পর্যন্ত বাস্তবই ছিল। সকল যাচাই-বাছাই শেষে ২০১৭ সালের ২ মে বান্দরবান সরকারি কলেজে প্রভাষক হিসেবে যোগদান করি।
আমার জীবনের ৩৫তম বিসিএস’র পূর্বের একটি বছরই ছিল টার্নিং পয়েন্ট। ওই এক বছরের প্রস্তুতিই আমাকে এ পর্যন্ত তিনটি সরকারি চাকরি পাইয়ে দিয়েছে। জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের অধীনে সহকারী রাজস্ব কর্মকর্তা এবং ডাক বিভাগে উপজেলা সহকারী পোস্টমাস্টার পদেও আমার চাকরি হয়।
আসলে ধৈর্য ধরে কষ্ট করলে যে কেউ সফল হবেই। এক্ষেত্রে কোনো বাধাই বাধা নয়। মামা, খালু, টাকা- এসব দিয়ে সবকিছু কেনা যায় কিন্তু সফলতা কেনা যায় না।
সকল শিক্ষার্থী ও চাকরি প্রার্থীদের উদ্দেশ্যে পরামর্শ, আসলে অধ্যবসায়ের বিকল্প নেই। যে সঠিকভাবে অধ্যবসায় করবে সফলতা তার কাছেই ধরা দেবে। কোনো প্রতিকূলতা এক্ষেত্রে বাধা হয়ে দাঁড়াবে না। এর অন্যতম উদাহরণ আমি নিজেই। দুর্গম, পিছিয়েপড়া রাঙ্গামাটির লংগদু উপজেলার দরিদ্র পিড়ীত আটারকছড়া ইউনিয়নের গ্রাম করল্যাছড়ি থেকে এসে চরম প্রতিকূলতার মধ্য দিয়ে যদি আমি বিসিএস ক্যাডার হতে পারি তাহলে আপনিও পারবেন ইনশাল্লাহ। সবার প্রতি দোয়া রইল। আমার জন্যও দোয়া করবেন।
আল আমীন: প্রভাষক, বান্দরবান সরকারি কলেজ।


No comments:
Post a Comment