Tuesday, September 26, 2017

আমি পড়তেই পছন্দ করি বেশি

ড. হায়াৎ মামুদ
বই পড়ার জন্য, বই জ্ঞানের জন্য। পাঠ্যপুস্তকের বাইরে মেধা ও মননের বিকাশে বইয়ের অবদান অপরিসীম। তাই শৈশব থেকেই বাবা-মায়েদের উচিত, বই পাঠের প্রতি ছেলেমেয়েদের উদ্বুদ্ধ করা। আজকাল প্রযুক্তির সহজলভ্যতা এবং তার যথেচ্ছ ব্যবহারের কারণে বইয়ের প্রতি অনেকের আগ্রহটা যেন হারিয়ে যাচ্ছে। মোবাইল ফোন, টেলিভিশন, ইন্টারনেটসহ এমন অনেক কিছুই আজ আমাদের দৈনন্দিন জীবনযাপন ও সময়ের বিশাল অংশ দখল করে নিয়েছে। ফলে বই পড়ার সময় কোথায়?
আসলে এভাবে আমরা অনেক পিছিয়ে পড়ছি। আশঙ্কা হচ্ছে, এখনই সচেতন না হলে আগামী দিনগুলোতে হয়তো এই নাজুক পরিস্থিতি আরও বাড়তে পারে।

আমাদের এখানকার মানুষদের বইয়ের প্রতি মমত্ববোধ অনেক কম। কলকাতায় গেলে দেখা যায়, তাদের প্রতিটি বাড়িতে কিছু না কিছু বই থাকবেই এবং তারা পড়েও; শুধু সাজিয়ে রাখার জন্য তারা বই রাখে না বাড়িতে। আমাদের এখানে কয়টি পরিবার আছে যারা বইয়ের প্রতি অন্তর থেকেই আন্তরিক? তাদের সংখ্যা হাতেগোনা। আমরা সাজগোজসহ নানা কাজে হাজার টাকা খরচ করতে রাজি, কিন্তু বই কিনতে রাজি না। বইয়ের প্রতি আমাদের আগ্রহ কম থাকার আরও একটি কারণ হচ্ছে, আমাদের অর্থনৈতিক সংকট, যা মানসিক সংকট তৈরি করে। বইয়ের প্রতি মানুষের আগ্রহ কমে যাওয়ার আরও একটি কারণ হচ্ছে, এখন লেখাপড়ার চেয়ে বৈষয়িক লাভ ও অর্থের প্রতি মানুষের আগ্রহ বেড়েছে। কে মূর্খ কে জ্ঞানী- এটা কোনো বিষয়ই না। ভাবখানা এই যে, টাকা-পয়সা আছে; তাহলেই চলবে!

আমাদের ছেলেবেলায় পাঠ্যবই ছাড়া অন্য কোনো বই পড়ার রেওয়াজ ছিল না। ক্লাসের বইয়ের বাইরের বই পড়লে বাবা-মায়েরা মার দিত সন্তানদের। তারা মনে করত, সন্তানদের পড়ালেখা নষ্ট হবে। পরীক্ষায় ফেল করবে। আমরা বই পড়তাম লুকিয়ে, সবার অলক্ষ্যে। এমনও হয়েছে, উপরে বিজ্ঞান বই আর নিচে গোয়েন্দা বই!

রেওয়াজ না থাকলেও আমার বই পড়ার অভ্যেসটা গড়ে উঠেছিল ছেলেবেলা থেকেই। সেটা শুরু হয়েছিল বাবার এক বন্ধুর ছেলের মাধ্যমে। তার বাড়ি থেকে স্কুলে যাওয়ার পথে ছিল আমাদের বাড়ি। বর্ষায় রাস্তায় পানি জমে যাওয়ায় তার বাড়ি থেকে স্কুলে যেতে সমস্যা হতো। একবার বর্ষায় সে আমাদের বাড়িতে কিছু দিন ছিল। তাদের বাড়িতে ছিল বই পড়ার রেওয়াজ। তার ভাইয়েরা শহরে থেকে পড়ালেখা করত। সেই বন্ধুর কাছ থেকেই মূলত বইয়ের প্রতি ভালোবাসা জন্মে আমার।

সে সময়ে দেব সাহিত্য কুটির ছিল প্রকাশনা জগতের এক অনন্য নাম। সেখান থেকে ভিপিযোগে বই আনা যেত। অভ্যেস গড়ে উঠবার পর টাকা জমিয়ে সেখান থেকে মাঝেমধ্যে বই আনাতাম। স্পষ্ট মনে আছে, সর্বপ্রথম একটি জীবনী গ্রন্থ আনিয়েছিলাম দেব সাহিত্য কুটির থেকে। বন্ধু-বান্ধবরাও বই পড়তে নিত। অনেক সময় তা আর ফেরত দিত না। চাইতেও পারতাম না। পরে তার কাছ থেকে অন্য বই পড়ার জন্যে নিয়ে এসে আর ফেরত দিতাম না। এভাবেই ধীরে ধীরে বইয়ের প্রতি ভালোবাসা তৈরি হয়।

আমি এমনিতেই কম লিখি। জীবনের এই প্রান্তে এসে আজ যখন নিজের লেখালেখির দিকে দৃষ্টি ফেরাই, দেখি তেমন কিছুই তো লিখতে পারিনি এই জীবনে। তবে আমার চাওয়া কম। তাই চাওয়া-পাওয়ার পার্থক্যও কম। টুকিটাকি পড়াশোনা আর দুই নাতি নিয়ে বেশ সময় কাটছে। আমি খুব আড্ডাবাজ মানুষ। আড্ডায় বসে আর যেন হুঁশ-জ্ঞান থাকে না। এর ভেতরেও কেউ কেউ জোরজবরদস্তি করে কিছু কিছু লেখা লিখিয়ে নেন। লেখালেখির ক্ষেত্রে আমার নির্দিষ্ট কোনো সময় নেই। তবে সাধারণত সন্ধ্যার দিকেই লেখালেখি বেশি হয়। এখানে একটি কথা বড় করে বলতে চাই, লেখাজোখার চেয়ে আমি পড়তেই পছন্দ করি বেশি। মাঝে মধ্যে মনে হয়, কত কত মহৎ গ্রন্থই না লেখা হয়েছে, সেসবের কণামাত্রও কি এক জীবনে পড়া সম্ভব। ভাবনাটি মাথায় এলে কেন জানি না বুকের গভীর থেকে একটা দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে আসে।

হায়াৎ মামুদ: জাহাঙ্গীর নগর বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের সাবেক অধ্যাপক, বাংলা ভাষা ও সাহিত্যে বিশেষ অবদানের জন্য ২০১৬ সালে পেয়েছেন একুশে পদক এবং শিশু সাহিত্যে বিশেষ অবদানের জন্য শিশু একাডেমি ও বাংলা একাডেমি থেকেও পেয়েছেন সাহিত্য পুরস্কার। 

No comments:

Post a Comment