Thursday, August 9, 2018

নৈতিকতাহীন শিক্ষার কোনো মূল্য নেই


মো. শাহজাহান শাহ::
জন্মগত বৈশিষ্ট্য অনুযায়ী আমরা অত্যন্ত দুর্বল একটি প্রাণি। কিন্তু বুদ্ধিমত্তায় অর্জন করেছি শ্রেষ্ঠত্ব। আমরা আমাদের চাহিদাগুলোকে একা পূরণ করতে পারি না বলে সমাজবদ্ধভাবে বসবাস করি। একে অপরকে সহযোগিতা করে থাকি। আর এ সহযোগিতামূলক মনোভাবই সমাজে নিয়ে আসে অনাবিল শান্তি। জ্ঞানার্জনের মধ্য দিয়ে ব্যক্তিগত, পারিবারিক ও সামাজিক শান্তি বজায় রেখে পারিবারিক ভারসাম্য রক্ষা করে জীবন যাত্রাকে অধিকতর সুন্দর করে তোলাই শিক্ষার মূল উদ্দেশ্য। তবে এ শিক্ষা হতে হবে নৈতিকতাসমৃদ্ধ। বর্তমানে অভিভাবকগণ সন্তানদের পড়ালেখায় সবচেয়ে বেশি উদ্বিগ্ন বিজ্ঞান, গণিত এবং ইংরেজি বিষয় নিয়ে। কীভাবে এসব জটিল বিষয় সহজে আয়ত্ত করে পরীক্ষায় ভালো ফলাফল করা যায় সেই কৌশল নিয়ে সবাই ব্যস্ত। শুধু পরীক্ষা পরীক্ষা আর পরীক্ষা! মনে হচ্ছে দেশে আর শিক্ষার্থী নেই। সকলেই পরীক্ষার্থী হয়ে গেছে। 

শিক্ষার উদ্দেশ্যই যে নৈতিকতা অর্জন, তা এখন আর আমাদের চিন্তা চেতনাতেই নেই। অথচ জীবনের প্রতিটি পদক্ষেপে নৈতিক শিক্ষার গুরুত্ব অপরিসীম। কারণ নৈতিক শিক্ষায় শিক্ষিত না হলে কখনো সঠিক এবং ভুলের পার্থক্য নির্ণয় করা সম্ভব নয়। প্রতিটি শিশু নৈতিক শিক্ষা অর্জন করবে- পিতা-মাতা, আত্মীয়-স্বজন এবং শিক্ষকদের নিকট থেকে। মা-বাবা, অভিভাবক কিংবা শিক্ষকের আচরণে বৈপরীত্য থাকলে তা শিশুদের মনে সাংঘাতিক প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থেকে শিশুরা যে শিক্ষা পায় সেটা বাস্তবে না মিললে তার মন দোদুল্যমান হয়ে উঠে। শিক্ষকের কাছ থেকে সে শিখে, সদা সত্য কথা বলতে হয়, ধূমপান ক্ষতিকর, দুর্নীতি না করা, অন্যায় ও অসৎ উপার্জন বর্জনীয় ইত্যাদি। শিক্ষকগণ এবং পিতামাতা শিশুদের জন্য রোল মডেল। কিন্তু তারা যখন দেখে তাদের আপনজনেরা মিথ্যা বলছে, ধূমপান করছে, অসৎ উপায়ে উপার্জন করছে তখন তারা সাংঘাতিক মানসিক চাপের মধ্যে পড়ে। কোনটি তারা গ্রহণ করবে, শিক্ষকদের নীতিবাক্য নাকি বিরাজমান বাস্তবতা। এই পরিস্থিতিতে তারা বাস্তবতাকে গ্রহণ করে নৈতিকতাহীন জীবন পরিচালনা করে। তখন কাছে ভালো মন্দের পার্থক্য হয়ে পড়ে মূল্যহীন।

সাধারণ মানুষ ছাড়াও আমরা যারা নিজেদেরকে এলিট হিসেবে পরিচয় দিতে স্বাচ্ছন্দ্য অনুভব করি, আমাদের মাঝেও নৈতিক শিক্ষার অভাব গভীরভাবে পরিলক্ষিত হচ্ছে। অন্যের উন্নতি নিজেকে অস্থির করে তোলে। পরশ্রীকাতরতা আমাদের আষ্টেপিষ্ঠে জড়িয়ে আছে। অন্যের ক্ষতি করে নিজের স্বার্থকে চরিতার্থ করি। অন্যের সমালোচনা করতে বিন্দুমাত্র সংকোচবোধ করছি না। অথচ অন্যের সুনাম প্রকাশে কণ্ঠনালী স্তব্ধ হয়ে যায়। এসবই আমাদের নৈতিকতা বিবর্জিত চরিত্রের বৈশিষ্ট্য।
এছাড়াও আমাদের সন্তানদের সুশিক্ষা এবং নৈতিকতা শিক্ষাদানে আমাদের সচেতনতার অভাব পরিলক্ষিত হচ্ছে। আমাদের প্রত্যাশা, সন্তানেরা শুধুমাত্র ভারি ভারি সার্টিফিকেট অর্জন করুক এতেই আমরা সন্তুষ্ট। অথচ নৈতিক শিক্ষার বিষয়ে সর্বোচ্চ উদাসীনতা প্রকাশ করি। আমাদের সন্তানরা কেথায় কী করছে সেদিকে কোনো খেয়ালই রাখছি না। তাদের গতিবিধি পর্যালোচনা করছি না। নৈতিক শিক্ষার অভাবে তারা মদ, জুয়া, সিগারেট, ফেনসিডিল এমনকি মেয়েদের সাথে অনৈতিক আড্ডায় সময় কাটাচ্ছে।

বর্তমানে তরুণ প্রজন্মকে ধ্বংসের দিকে ঠেলে দিচ্ছে মোবাইল ফোন ও ইন্টারনেট। এটি নতুন প্রজন্মকে নৈতিকতা বিবর্জিত মেধাহীন অলস জাতিতে পরিগণিত করছে। আমাদের ছেলেমেয়েরা পড়ার টেবিলে বসে পড়ালেখা বাদ দিয়ে মোবাইলে ইন্টারনেট ব্যবহার করে বন্ধু-বান্ধবীর সাথে আড্ডা দিয়ে সময় কাটাচ্ছে। মোবাইল ফোন ব্যবহার করে বিপরীত লিঙ্গের সাথে নির্জনে নৈতিকতা বিবর্জিত আড্ডায় লিপ্ত হচ্ছে। ইন্টানেট বা ভিডিও মোবাইল ব্যবহার করে কুরুচিপূর্ণ ছবি এবং ভিডিও দেখছে যা অত্যন্ত গর্হিত ও নৈতিকতা বিবর্জিত কাজ। অথচ আমরা অভিভাবকরা আমাদের সন্তানদের গতিবিধি লক্ষ করছি না। তাদের পড়াশোনার প্রতি খেয়াল রাখছি না। আমাদের অগোচরে অনৈতিক কর্মকা- করে তারা নিজেরা এবং আমাদেরকে সামাজিকভাবে হেয় প্রতিপন্ন করে। তখন আমাদের লজ্জার শেষ থাকে না। অনেক সময় দেখা যাচ্ছে, নৈতিক অধঃপতনের কারণে নিজ সন্তানের হাতেই খুন হচ্ছে পিতা-মাতা। অথচ তাদের এই নৈতিকতা বিবর্জিত আদর্শহীন চরিত্রের জন্য অভিভাবকেরাই দায়ী। মোবাইল ও ইন্টারনেট যে সবসময় ক্ষতিকর তা নয়। সঠিক ব্যবহারে আমরা এর সুফলও পেতে পারি, তবে আমাদের অভিভাবকদের এক্ষেত্রে সতর্ক থাকতে হবে। সন্তানের গতিবিধি লক্ষ রাখতে হবে। প্রচলিত পাঠ্যবইয়ে নৈতিকতা বিষয়ে যা আছে তা একেবারেই অপ্রতুল। তাই পাঠ্যবইগুলোতে নৈতিক শিক্ষা আরো বৃদ্ধি করতে হবে। এক সময় মনে করা হতো শিক্ষা জাতির মেরুদণ্ড, কিন্তু বর্তমানে এর গ্রহণযোগ্যতা হ্রাস পেয়েছে। সে শিক্ষা অনেক ক্ষেত্রেই আমাদের মেরুদ- ভেঙ্গে দিচ্ছে। যে শিক্ষা সৎ ও আদর্শ মানুষ তৈরি করে না, তা কখনো শিক্ষা হতে পারে না। তাই এখন থেকে বলতে হবে, সুশিক্ষাই জাতির মেরুদ-। সমাজে সকল স্তরে সুশিক্ষার বীজ রোপণ করতে হবে। শুধু পরীক্ষায় পাস নয়, শিক্ষার্থীর হৃদয় মন যাতে সুন্দর হয়, জাতীয় চেতনা ও মানবতাবোধ উজ্জীবিত হয় সে দিকে লক্ষ রেখে সিলেবাস প্রণয়ন এবং পাঠদান করতে হবে। আদর্শবান শিক্ষক নিয়োগ দিতে হবে। পিতামাতা সন্তানদের প্রতি প্রচুর সময় দিতে হবে। পারিবারিক ও প্রাতিষ্ঠানিকভাবে নৈতিক শিক্ষা প্রদান করতে হবে। তবেই প্রাত্যাহিক জীবনে নৈতিক শিক্ষার বীজ প্রস্ফুটিত হয়ে গড়ে উঠবে এক আদর্শ সমাজ।

শাহজাহান শাহ : সহকারী  শিক্ষক, কাকপাড়িয়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়।

No comments:

Post a Comment