ইয়াছিন রানা সোহেল
স্বাধীনতা সংগ্রামে নিজের জীবন উৎসর্গ করে দেশপ্রেমের এক অনন্য নজির স্থাপন করেছিলেন শহিদ এম আবদুল আলী। ১২ দিনের নির্মম নির্যাতনের পর তাঁর দেহ টুকরো টুকরো করে বস্তা বন্দি করে ফেলে দেয়া হয়েছিল কাপ্তাই হ্রদের অথৈ জলে। কিন্তু দেশ স্বাধীন হওয়ার পর সেই ইতিহাস চাপা পড়েছিল দীর্ঘ ৪৪ বছর।
স্বাধীনতা সংগ্রামে নিজের জীবন উৎসর্গ করে দেশপ্রেমের এক অনন্য নজির স্থাপন করেছিলেন শহিদ এম আবদুল আলী। ১২ দিনের নির্মম নির্যাতনের পর তাঁর দেহ টুকরো টুকরো করে বস্তা বন্দি করে ফেলে দেয়া হয়েছিল কাপ্তাই হ্রদের অথৈ জলে। কিন্তু দেশ স্বাধীন হওয়ার পর সেই ইতিহাস চাপা পড়েছিল দীর্ঘ ৪৪ বছর।
দেশের এক দশমাংশ অবিভক্ত পার্বত্য জেলা রাঙামাটির এসডিও (সাব-ডিভিশন অফিসার) তথা মহকুমা প্রশাসক হিসেবে ১৯৭০ সালের ২০ নভেম্বর যোগদান করেছিলেন এম আবদুল আলী। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নির্দেশেই তিনি রাঙামাটির দায়িত্ব নিয়েছিলেন। কারণ এই পদে দায়িত্বরত ছিলেন বঙ্গবন্ধুর ভগ্নিপতি সৈয়দ হোসেন। আর দুর্গম পার্বত্যাঞ্চলে কর্মরত থাকায় তাঁকে নিয়ে পরিবার ও স্বজনরা বেশ চিন্তিত ছিলেন। অবশেষে এসডিও হিসেবে পদোন্নতি পাওয়ার পরপরই এম আবদুল আলীকে রাঙামাটি মহকুমা প্রশাসক হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণের জন্য বঙ্গবন্ধু নির্দেশ দেন। ৭০-এর নির্বাচনের পর যখন পাকিস্তানিরা ক্ষমতা হস্তান্তরে গড়িমসি করছিল তখন পূর্ব পাকিস্তানে অলিখিতভাবে বঙ্গবন্ধুর শাসনই চলছিল।
বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের ঐতিহাসিক ভাষণের পরেই স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশের স্বপ্নে বিভোর মুক্তিকামী বাঙালিরা যুদ্ধের প্রস্তুতি নিতে থাকেন। তখন দুর্গম পার্বত্যাঞ্চলে মুক্তিকামী ও সংগ্রামী মানুষদের ঐক্যবদ্ধ করে তাদেরকে জেলা সদরের পুলিশ লাইন ও স্টেশন ক্লাবে ছাত্র, যুবক ও জনসাধারণকে যুদ্ধ প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করেছিলেন। পুলিশ সুপার বজলুর রহমান ও মহকুমা প্রশাসক হিসেবে এম আবদুল আলীই প্রশিক্ষণের সার্বিক দেখাশুনা করতেন। ২৫ মার্চের আগেই মহকুমা প্রশাসক এম আবদুল আলী জেলার প্রত্যন্ত অঞ্চলে কর্মরত ইপিআর (বর্তমানে বিজিবি) ও পুলিশ বাহিনীর অবাঙালি সদস্যদের নিরস্ত্র করে ক্লোজ করে নিয়ে আসেন। সাথে বাঙালি সৈনিকদের প্রস্তুত রাখা হয়, নির্দেশ দেয়ার সাথে সাথেই যেনো সকলেই রাঙামাটি শহরে চলে আসে এবং অবাঙালি সদস্যদের গ্রেফতার করে।
২৫ মার্চের পর জেলা প্রশাসক এইচ টি ইমাম, অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক সৈয়দ আবদুস সামাদ ও পুলিশ সুপার বজলুর রহমানসহ প্রশাসনিক গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিবর্গ নিরাপদ আশ্রয়ে সীমান্তের ওপারে চলে গিয়েছিলেন। কিন্তু সুযোগ থাকা সত্ত্বেও এবং ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাগণ বারবার বলার পরেও এম আবদুল আলী সীমান্তের ওপারে যাননি। দিন যতই গড়াতে থাকে রাঙামাটি ততই জনশূন্য হয়ে পড়তে থাকে। এদিকে উল্কার মতো শহরের এ প্রান্ত থেকে ও প্রান্ত পর্যন্ত চষে বেড়াতে থাকেন এম আবদুল আলী। আর মুক্তিকামী ও সংগ্রামী মানুষদের ঐক্যবদ্ধ করে সাহস যোগাতে থাকেন। তাদের প্রশিক্ষণ এবং অস্ত্রের ব্যবস্থাও করেন।
১৪ এপ্রিল পাকিস্তানি দোসরদের সহায়তায় রাঙামাটি দখলে নেয় শত্রু বাহিনী। এম আবদুল আলী তখনো জানতেন না, রাঙামাটি শত্রু বাহিনী দখলে নিয়েছে। ১৬ এপ্রিল ডিসি বাংলো ঘাটে স্পিড বোটযোগে অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে আসেন তিনি। বোট ঘাটে ভিড়ার সাথে সাথেই পাকিস্তানি সৈন্যরা দৌড়ে নেমে আসে। শত্রু বাহিনী রাঙামাটি দখলে নিয়েই খুঁজতেছিল জেলা প্রশাসক এইচ টি ইমাম, অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক সৈয়দ আবদুস সামাদ, পুলিশ সুপার বজলুর রহমান, এসডিও এম আবদুল আলীর মতো ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের। স্পিডবোটযোগে যেহেতু এসেছে সে হিসেবে নিশ্চয়ই বড় কোনো সরকারি কর্মকর্তা হবেন, তাই পাকিস্তানি সৈন্যরা আবদুল আলীকে গ্রেফতার করে। যখন পরিচয় নিশ্চিত হলো তখন পাকিস্তানি সৈন্যরা ‘শুয়োর কা বাচ্চা’ বলে রাইফেলের বাট দিয়ে তাঁর মাথা ফাটিয়ে দেয়। আর বোটের পাটাতন উল্টাতেই দেখে- বস্তা ভর্তি সব অস্ত্র ও গোলাবারুদ। এ সময় এম আবদুল আলীর সাথে তাঁর বড় ছেলে ইউসুফ হারুনও গ্রেফতার হন। প্রথমে আবদুল আলীকে জিজ্ঞেস করা হয় এইচ টি ইমামসহ প্রশাসনের উচ্চ পদস্থ ব্যক্তিরা কোথায় আশ্রয় নিয়েছেন? মুক্তিযোদ্ধারা কোন পথ দিয়ে গিয়ে কোথায় প্রশিক্ষণ নিচ্ছেন? আর তাদের অস্ত্র ও রসদ কোথা থেকে সরবরাহ করা হচ্ছে? কিন্তু কোনো কথারই উত্তর দিচ্ছিলেন না তিনি। এরপরই তাঁর ওপর নেমে আসে অমানুষিক নির্যাতন। তাঁর কাছ থেকে কথা বের করার জন্য প্রথমে তাঁর আঙ্গুলে সুঁই ফুটানো হয়। এরপর হাতের সব আঙ্গুলের নখ উপড়ে ফেলা হয়।
বারবার চেষ্টা করেও যখন পাকিস্তানি সৈন্যরা কোনো তথ্যই বের করতে পারছিল না তখন পিতা-পুত্রের ওপর অভিনব কায়দায় চালানো হয় নির্যাতন। ফ্যানের সাথে টানিয়ে বেত্রাঘাত করা হতো পিতা-পুত্রকে। অন্ধকার ঘরে তাঁদের দুজনকে বন্দি করে রাখা হতো। সিগারেটের ছ্যাঁকা দেয়া হতো শরীরে। এ বন্দি দশা থেকে তাঁদের মুক্ত হওয়ার কোনো পথই ছিলো না। পিতা-পুত্রের এই দৈন্যদশা দেখে পাহারাদারের মনে দয়া হলো। তিনি জানালার শিক খুলে দিয়ে ছেলে ইউসুফ হারুনকে পালিয়ে যাওয়ার ব্যবস্থা করে দেন। পুত্র পালিয়ে যাওয়ার পর পিতার ওপর নির্যাতনের মাত্রা আরো বেরে যায়। একদিন তাঁকে লম্বা রশি দিয়ে জিপের পিছনে বেঁধে টানা হয়। চলন্ত জিপের পিছনে কিছুক্ষণ দৌড়ানোর পর তিনি পড়ে যান। তারপর তাঁকে ছেঁচড়ানো হয়। এতে করে তাঁর শরীর ক্ষত-বিক্ষত হয়ে পড়ে। এভাবে গাড়ি দিয়ে তাঁকে টানা হচ্ছে, আর পাকিস্তানি সৈন্যরা জোরে জোরে চিৎকার করে লোকজনকে জানাতে থাকে, ‘তোমারা এসডিও বাপ কা হালত দেখো; তোমারা এসডিও বাপ কা কিয়া হালত হ্যায় দেখো’। ১২ দিনের নির্মম নির্যাতনের পর ২৭ এপ্রিল ক্ষত-বিক্ষত আবদুল আলীর নিথর দেহটি কেটে টুকরো টুকরো করে বস্তা বন্দি করে ফেলে দেয়া হয় কাপ্তাই হ্রদের পানিতে।
এম আবদুল আলী রাঙামাটিতে এসডিও হিসেবে যোগদানের পর শহরের ‘কায়েদে আজম মেমোরিয়াল একাডেমি’ স্কুল পরিচালনা কমিটির সভাপতির দায়িত্বও পড়ে তাঁর ওপর। দেশ স্বাধীন হওয়ার পর এই স্কুলের নাম পরিবর্তনের প্রয়োজনীয়তা দেখা দিলে সর্বসম্মতভাবে স্কুল পরিচালনা কমিটির সকলে যুদ্ধে প্রাণ উৎসর্গকারী এম আবদুল আলীর নামে নামকরণের প্রস্তাব করেন। ফলে স্কুলটির নাম ‘শহীদ আবদুল আলী একাডেমি’ করা হয়। এছাড়াও শহরের পুরাতন স্টেডিয়ামের পাশে আইয়ুব খানের আমলে বসানো একটি ফলক উপড়ে ফেলে স্থানটিকে শহিদ এম আবদুল আলীর নামে করা হয়।
স্বাধীনতা সংগ্রামে জীবন উৎসর্গকারী এই বীর সৈনিকের বীরত্বগাঁথা কিংবা যুদ্ধে তাঁর অবদান নিয়ে ছিল না কোনো কাগুজে ডকুমেন্ট। তাঁর নামে প্রতিষ্ঠিত স্কুলে তাঁর একটি আঁকা ছবি ছাড়া আর কিছুই ছিল না। স্কুলের শিক্ষক-শিক্ষার্থীরাও জানতো না কে এই শহিদ আবদুল আলী। এই শহিদ পরিবারের সাথেও রাঙামাটির কারো যোগাযোগ ছিল না। পালন করা হতো না তাঁর মৃত্যুবার্ষিকীও। এমনকি জাতীয় দিবস সমূহেও তাঁর বেদীতে শ্রদ্ধা জানানো হতো না। অবশেষে ২০০৫ সাল থেকে খুঁজতে থাকি শহিদ এম আবদুল আলীর ইতিহাস ও তাঁর পরিবারের সদস্যদের। শহরের প্রবীণ অনেক ব্যক্তির কাছে গিয়েও ব্যর্থ হয়ে ফিরেছি বারবার। এখানে-সেখানে তাঁর ইতিহাস ও পরিবারের সদস্যদের খুঁজে বের করার নিরন্তর প্রচেষ্টা চালাতে থাকি। ২০১২ সালের গ্রীষ্মের এক দুপুরে রাঙামাটি প্রেস ক্লাবের পাশে চা-দোকানে বসে আছি। এমন সময় এক ভদ্রলোক এসে জিজ্ঞেস করলেন, শহিদ এম আবদুল আলীর নামে করা বেদীটি কোথায় বলতে পারেন? কথা শুনেই দাঁড়িয়ে গেলাম। সাথে একজন ভদ্র মহিলাও ছিলেন। ভদ্রলোকের স্ত্রী। একশ’ গজ দূরে অবস্থিত বেদীতে নিয়ে গেলাম তাঁদের। ভদ্রলোক ছিলেন শহিদ এম আবদুল আলীর ভাগ্নি জামাই।
তাঁদের মাধ্যমে খুঁজে পেলাম শহিদ এম আবদুল আলীর সন্তানদের। এরপর যোগাযোগ শুরু করলাম। সংগ্রহ করতে লাগলাম স্বাধীনতা সংগ্রামে আত্মোৎসর্গকারী এই বীর সেনার তথ্য ও চিত্র। অবশেষে ২০১৫ সালের ২৭ এপ্রিল প্রকাশ করি তাঁর জীবনী গ্রন্থ ‘মহান স্বাধীনতা সংগ্রামের অকুতোভয় বীর শহিদ এম আবদুল আলী’ নামক বইটি। বইটি প্রকাশ হওয়ার পর সর্বত্রই এই বীর শহিদের বীরত্বগাঁথা আলোচিত হতে থাকে। তৎকালীন রাঙামাটি জেলা প্রশাসক মো. সামসুল আরেফিনের চেষ্টায় বিষয়টি নজরে আসে সরকারের। ফলে মহান স্বাধীনতা সংগ্রামে অসামান্য ও অনবদ্য অবদানের স্বীকৃতি স্বরূপ শহিদ এম আবদুল আলীকে ২০১৬ সালে মরণোত্তর রাষ্ট্রীয় সর্বোচ্চ সম্মাননা স্বাধীনতা পুরস্কারে ভূষিত করে সরকার। ২০১৬ সালের ২৪ মার্চ প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার হাত থেকে শহিদ এম আবদুল আলীর কনিষ্ঠ কন্যা নাজমা আকতার পুরস্কার গ্রহণ করেন। আর এটিই তিন পার্বত্য জেলায় প্রথম স্বাধীনতা পদক।
ইয়াছিন রানা সোহেল: পার্বত্যাঞ্চলের মুক্তিযুদ্ধ ও পর্যটন বিষয়ক লেখক।
ইয়াছিন রানা সোহেল: পার্বত্যাঞ্চলের মুক্তিযুদ্ধ ও পর্যটন বিষয়ক লেখক।


No comments:
Post a Comment