শহিদুল ইসলাম কামাল::
গুলশাখালী শিক্ষা-দীক্ষায় পিছিয়ে থাকা একটি জনপদ। নব্বইয়ের দশকে সারা গুলশাখালীতে এসএসসি পাশ করা কিংবা এসএসসিতে পড়–য়া কোনো ছাত্র ছিল না। আমি তখন সবেমাত্র নবম শ্রেণিতে পড়ি। গুলশাখালী আদর্শ উচ্চ বিদ্যালয়টি তখন শিক্ষার আলো ছড়ানোর একমাত্র প্রতিষ্ঠান। হাতেগোনা আমরা কয়েক জন ছাত্র-ছাত্রী। ১৯৮৮ সালের দিকে গুলশাখালীতে বিডিআরের (বর্তমানে বিজিবি) ৭ রাইফেল ব্যাটালিয়নের কার্যক্রম শুরু হয়। তখন থেকেই গুলশাখালীতে মানুষজন একটু একটু করে শিক্ষার মূল্য উপলব্ধি করতে থাকে। বাংলাদেশের শেষ সীমানার লোকালয় গুলশাখালীতে শিক্ষার প্রসার হতে শুরু করে। এর জন্য শ্রদ্ধার সাথে স্মরণ করতে হয়
তৎকালীন ব্যাটালিয়ন কমান্ডার মেজর নুরুল আমিন পাটুয়ারি মহোদয়কে। যিনি গুলশাখালীর মতো পিছিয়ে থাকা একটা প্রত্যন্ত এলাকার শিক্ষা বিস্তারের জন্য গুলশাখালী জুনিয়র হাই স্কুলের একটি ঘর নিমার্ণ করে দেন। শিক্ষক নিয়োগ প্রদান করেন। শুরু হয় নতুন পথের যাত্রা।
গুলশাখালী থেকে প্রথম এসএসসি পাশ ছাত্র বের হয় ১৯৯২ সালে। সকল প্রতিকূলতা মোকাবেলা করে এক পা দু’পা করে গুলশাখালী এগুতে থাকে। ১৯৯৪ সালে আমরা গুলশাখালীর ১৬ জন শিক্ষার্থী এসএসসি পরীক্ষায় অংশ নিয়েছিলাম। এর মধ্যে লংগদু সরকারি উচ্চ বিদ্যালয় থেকে ১৩ জন, একজন রাঙ্গামাটি রানী দয়াময় উচ্চ বিদ্যালয় থেকে (বর্তমান ডিজিএফআইতে কর্মরত), আরেকজন কাচালং উচ্চ বিদ্যালয় থেকে। আর আমি অংশ নিয়েছিলাম রাঙ্গুনিয়া ঘাটচেক উচ্চ বিদ্যালয় থেকে। আমরা যারা এলাকার বাইরের স্কুল থেকে পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করি তারা তিনজনই ভালোভাবে পরীক্ষায় কৃতকার্য হই। কিন্তু এলাকার ১৩ জন পরীক্ষার্থীর সবাই ফেল করে। তৎকালীন সময়ের একজন মুরুব্বী ফেল করার ছাত্র-ছাত্রীদের ডেকে নিয়ে, তাদেরকে ‘ফেল্লু কমিটি’ গঠন করতে বলেন। যেখানে প্রয়োজন ছিল তাদের সান্ত¦না দিয়ে উৎসাহ প্রদানের, সেখানে করা হলো তিরস্কার! আমার বন্ধুদের এহেন ফলাফল আমাকে ব্যথিত করে। পরবর্তী বছর আমি তিন মাস তাদের সাথে থেকে উৎসাহ দিই, সাধ্যমত পরীক্ষার প্রস্তুতির জন্য সহযোগিতা করি। এভাবে ১৯৯৫ সালে আমার সেই ‘ফেল্লু কমিটি’র বন্ধুরা সকলেই একযুগে পাশ করে, গুলশাখালীকে আলোকিত করে। সেই ব্যাচের অনেক বন্ধু এখন ভালো ভালো জায়গায় সম্মানের সাথে প্রতিষ্ঠিত।
এদিকে ১৯৯৬ সালে আমার দুই বন্ধুর পরামর্শে জনাব দীপংকর তালুকদারকে গুলশাখালী জুনিয়র হাই স্কুলের এমপিও’র জন্য তার বাসায় গিয়ে অনুরোধ জানাই। আমার সেই ছোট্ট অনুরোধটিকে গুরুত্ব দিয়ে তিনি নিজে তৎকালীন প্রধান শিক্ষক জনাব আনিছুর রহমান স্যারকে সাথে নিয়ে ব্যানবেইচ অফিসে গিয়ে জুনিয়র সেকশনের স্যারদের এমপিও’র ব্যবস্থা করে দেন। সেই থেকে গুলশাখালী এলাকার শিক্ষা ব্যবস্থায় গতি সঞ্চার হয়। যা দীর্ঘদিন ধরে এলাকার মানুষের কাম্য ছিল।
অপরদিকে আমার ১৩ জন বন্ধুর ফেল করা এবং তার পরিপ্রেক্ষিতে তাদের তিরস্কৃত হওয়া আমার উপলব্ধিতে দাগ কাটে। যার দরুণ তৎকালীন সময়ে রাঙ্গামাটি সরকারি কলেজে অধ্যয়নরত দুই জন উদিয়মান সাহসী মাধাবী ছাত্রের সাথে মতবিনিময় করি। তাদের একজন আবুল কালাম আজাদ বর্তমান পূবালী ব্যাংকে ÔBest of the Best ManegerÕ, আরেকজন ইনকিলাব পত্রিকার সাব-এডিটর সৈয়দ ইবনে রহমত। আমাদের তিন জনের আলোচনায় একটি বিষয় উঠে এলো যে, আমরা যদি প্রতিবছর বিভিন্ন পরীক্ষায় কৃতকার্য ছাত্রছাত্রীদের এলাকার অন্যান্য ছাত্রছাত্রী এবং অভিভাবকদের সামনে তুলে ধরতে পারি তাহলে মানুষজন শিক্ষার গুরুত্ব বুঝবে। শিক্ষা গ্রহণের জন্য মানুষের মাঝে একটি প্রতিযোগিতা কাজ করবে। যেই চিন্তা সেই কাজ। ১৯৯৬ সালে গুলশাখালীতে প্রথম বিএ পাশ করলো একজন, তখন এলাকার উৎসাহী, উদ্দমী ছাত্রদের নিয়ে আমাদের গর্বের উৎস বিএ পাশ করা সেই ভাইয়ের সংবর্ধনার আয়োজন করি, গুলশাখালী মডেল সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় হল রুমে। ১৯৯৬ সালে প্রথম সংবর্ধনা অনুষ্ঠানের প্রধান অতিথি ছিলেন রাজনগর বিজিবি জোনের জোন কমান্ডার লে. কর্নেল হারুন অর রশিদ। সে দিনের সে অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথিসহ এলাকার শ্রদ্ধেয় শিক্ষকম-লী এবং মুরুব্বীদের পরামর্শ এবং উৎসাহে এরপর থেকে প্রতিবছর কৃতকার্য বন্ধুদের নিজেরা ২/৪ টাকা চাঁদা দিয়ে সংবর্ধনার অনুষ্ঠানের কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছিলাম। সেই সময়টুকুতে অনেক মানুষ যেমন আমাদের উৎসাহ দিতেন, ঠিক একই সাথে সংবর্ধনা কাজটিকে তারা অনর্থক টাকা খরচের উপলক্ষও মনে করতেন। কিন্তু আমরা থেমে যাইনি। আমাদের সেই প্রচেষ্টার ফলই আজকের ‘ফরমার স্টুডেন্ট অ্যাসোসিয়েশন অব গুলশাখালী’।
সময়ের ব্যবধানে আজ ‘ফরমার স্টুডেন্ট অ্যাসোসিয়েশন অব গুলশাখালী’ একটি বিদ্যোৎসাহী সংগঠন হিসেবে ব্যাপক পরিচিত। সংগঠনটি শিক্ষার্থীদের মানসিক বিকাশের লক্ষ্যে সাংস্কৃতিক চর্চা ও প্রতিযোগিতার ব্যবস্থাও করে আসছে। এতে করে শিক্ষার্থীদের মনে প্রতিযোগিতার মনোভাব সৃষ্টি হচ্ছে। ইতোমধ্যে বিভিন্ন পাবলিক পরীক্ষায় দেশের সেরা ফলাফল আমাদের এই প্রত্যন্ত গুলশাখালীকে সারাদেশের সামনে তুলে ধরেছে। গত ২০১৬ সালে এইচএসসি পরীক্ষায় আমাদের গুলশাখালীর সোনার ছেলে মো. মাইনুল ইসলাম সোহাগ ঢাকার নটরডেম কলেজ থেকে ঢাকা বোর্ডে ৪র্থ মেধাস্থান অর্জন করে। একই সাথে গণিতে ২০০ নম্বরের পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করে ১৯৮ নম্বর অর্জন করে সারাদেশে প্রথম স্থান অর্জন করে।
তার মতো অনেক মেধাবী মুখের জন্ম হচ্ছে গুলশাখালীতে। এইরমধ্যে ইঞ্জিনিয়ার, আইনজীবী, ব্যাংকার, সাংবাদিক পেশায় অনেকেই সুনাম অর্জন করেছে। আমরা আশায় আছি, এক সময় দেশের বরেণ্য শিক্ষাবিদ, জ্ঞানী-গুণী মানুষের জন্ম হবে এই গুলশাখালীতে।
গুলশাখালীর শিক্ষার ব্যবস্থায় প্রাণ সঞ্চারের লক্ষ্যে জননেতা দীপংকর তালুকদার সীমান্ত প্রহরী উচ্চ বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার জন্য প্রয়োজনীয় সকল প্রকার সহযোগিতা প্রদান করেছেন। গুলশাখালী বর্ডার গার্ড মডেল কলেজের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করে এবং কলেজটির সার্বিক উন্নয়নের লক্ষ্যে সার্বক্ষণিক কাজ করে যাচ্ছেন। আশা করি, একসময় পার্বত্য জেলায় একটি আধুনিক শিক্ষা প্রতিষ্ঠান হিসেবে গুলশাখালী বর্ডার গার্ড মডেল কলেজ স্বীকৃতি পাবে। এছাড়াও তিনি ফরমার স্টুডেন্ট অ্যাসোসিয়েশন অব গুলশাখালীকে পৃষ্ঠপোষকতার মাধ্যমে এর কার্যক্রমকে ত্বরান্বিত করেছেন। ফরমার স্টুডেন্ট অ্যাসোসিয়েশন অব গুলশাখালী একটি অরাজনৈতিক শিক্ষা উন্নয়নমূলক সংগঠন। আমাদের ইচ্ছা, একদিন আমরা এই ছোট্ট সংগঠনটিকে একটি প্রতিষ্ঠান হিসেবে দেখতে পাব। আমাদের এই গুলশাখালী একদিন নিরক্ষর মুক্ত হবে। এখানে গড়ে উঠবে ল্যাংগুয়েজ ক্লাব, স্পোটর্স ক্লাব এবং কর্মজীবী মানুষের জন্য টেকনিক্যাল ট্রেনিং সেন্টার।
সুন্দর স্বপ্ন, সুন্দর দিন, আর সোনালি সময়ের প্রত্যাশায় ফরমার স্টুডেন্ট অ্যাসোসিয়েশন অব গুলশাখালী’র জন্য উজ্জ্বল ভবিষ্যৎ কামনা করি।
শহিদুল ইসলাম কামাল: প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি, ফরমার স্টুডেন্ট অ্যাসোসিয়েশন অব গুলশাখালী।

দোয়া ও শুভকামনা রইলো কাকা
ReplyDelete