Friday, September 22, 2017

‘ফরমার স্টুডেন্ট অ্যাসোসিয়েশন অব গুলশাখালী’ কী এবং কেন?


সংগঠনের কার্যক্রম: রাঙ্গামাটি জেলাধীন লংগদু উপজেলার ৩নং ইউনিয়ন গুলশাখালী। কাচালং নদী ও কাপ্তাই লেকের কারণে উপজেলা সদরসহ দেশের মূল ভূখণ্ড থেকে সড়ক যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন এই ইউনিয়নের প্রাক্তন ছাত্রছাত্রীদের নিয়ে গঠিত ‘ফরমার স্টুডেন্ট অ্যাসোসিয়েশন অব গুলশাখালী’র কার্যক্রম শুরু হয়েছিল ১৯৯৬ সালে। সে বছর রাঙ্গামাটি সরকারি কলেজ থেকে এলাকার প্রথম শিক্ষার্থী হিসেবে বিএ পাস করেছিলেন
মো. আবছার আলী। তাঁকে সংবর্ধনা দিতে গিয়েই গোড়াপত্তন হয়েছিল এই সংগঠনের। তবে শিক্ষার প্রতি এলাকাবাসীর উদাসীনতা এবং প্রতিকূল পরিবেশে যারা চেষ্টা করেও কাক্সিক্ষত সাফল্য পাচ্ছিল না তাদের প্রতি তিরস্কার থেকেও আমরা উদ্বুদ্ধ হয়েছিলাম এমন কিছু করার, যার মাধ্যমে মানুষের মধ্যে শিক্ষার প্রতি আগ্রহ জন্ম হবে, এর গুরুত্ব বুঝতে পারবে সবাই, ক্রমান্বয়ে শিক্ষার আলো ছড়িয়ে পড়বে মানুষের ঘরে ঘরে। সেই থেকে নিজেদের পকেট থেকে ২/৪ টাকা করে দিয়ে প্রতি বছর বিভিন্ন পাবলিক পরীক্ষা এবং বৃত্তি পরীক্ষায় যারা সফলতা অর্জন করছে তাদের সংবর্ধনা প্রদান করে সম্মানিত করে আসছে এই সংগঠন। একই সাথে গুণীজনদের সংবর্ধনা প্রদান ও শিক্ষার্থীদের সাংস্কৃতিক চর্চার মাধ্যমে এলাকাবাসীর বিনোদনেরও ব্যবস্থা করা হচ্ছে। প্রথম বছর আমাদের বাজেট ছিল ১৩শ’ টাকার কিছু বেশি, ২০১৭ সালে এসে সে বাজেট দাঁড়িয়েছে প্রায় দুই লাখ টাকা। জ্ঞানের প্রতীক বই; কিন্তু গুলশাখালীর মতো দুর্গম এবং প্রত্যন্ত এলাকায় শিক্ষার্থীদের পক্ষে প্রয়োজনীয় পাঠ্য বই সংগ্রহ করাই যখন দুরুহ, তখন সিলেবাস বহির্ভূত বই কিনে জ্ঞান চর্চার বিষয়টি বিলাসিতার পর্যায়েই পড়ে। তাই সংগঠনের পক্ষ থেকে প্রতি বছর সংবর্ধিত শিক্ষার্থী ও গুণীজনদের হাতে পুরস্কার হিসেবে তুলে দেয়া হচ্ছে অন্তত দুইশ’ করে বই। ইত্যোমধ্যে আড়াই হাজারের বেশি বই বিতরণ করা হয়েছে। আমাদের এই পথচলায় অনেকেই আগ্রহী হয়ে অর্থ ও পরামর্শ দিয়ে সহায়তা করেছেন। এলাকার সকল শ্রেণি-পেশার মানুষের সম্মিলিত প্রচেষ্টা এবং ভালোবাসা ধারণ করে সংগঠনটি পার করেছে ২১টি বছর। এই দীর্ঘ সময়ের ব্যবধানেও আমরা প্রত্যাশা পূরণে পরিপূর্ণভাবে সফল হয়েছি এটা বলার সুযোগ নেই। তবে এটা সত্য যে, অনেক ভুল-ত্রুটির পরও আমরা একটা পথরেখা সৃষ্টি করতে পেরেছি, যে পথ ধরে আগামী প্রজন্ম স্বপ্ন পূরণের লক্ষ্যে এগুতে পারবে।

শুরুতে সংগঠনের কোনো কাঠামো ছিল না। ধীরে ধীরে এর কার্যক্রমে আসে ব্যাপকতা। ২০০৩ সালে এসে প্রথমবারের মতো ‘ফরমার স্টুডেন্ট অ্যাসোসিয়েশন অব গুলশাখালী’র আনুষ্ঠানিক কমিটি করা হয়। সিদ্ধান্ত হয়, বার্ষিক কার্যক্রম পরিচালনার জন্য এক বছর মেয়াদি একটি ‘স্ট্যান্ডিং কমিটি’ গঠন করা হবে। আর স্ট্যান্ডিং কমিটির যিনি একবার সভাপতি হবেন তিনি আর কখনোই এর সভাপতি হতে পারবেন না। অস্থায়ী ভিত্তিতে স্ট্যান্ডিং কমিটি দিয়ে কয়েক বছর চলার পর সংগঠনের একটি স্থায়ী অভিভাবক ফোরামের প্রয়োজনীয়তা দেখা দেয়। বিশেষ করে যারা প্রতিষ্ঠাতা সদস্য ছিলেন এবং যারা স্ট্যান্ডিং কমিটিতে সভাপতির দায়িত্ব পালন করেছেন তাদের নিয়ে একটি স্থায়ী কমিটির ভাবনা শুরু হয়। ২০১৩ সালে এসে সেই ভাবনা থেকেই গঠন করা হয় ‘স্থায়ী কমিটি’। যাদের ওপর দায়িত্ব বর্তায় স্ট্যান্ডিং কমিটিকে তাদের কার্যক্রম পরিচালনায় সার্বিক সহায়তা করা। সংগঠনের কার্যক্রম দেখে মুগ্ধ হয়ে তৎকালীন পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী বাবু দীপংকর তালুকদার দুই লাখ টাকা অনুদান প্রদান করেন। সিদ্ধান্ত হয়, এই তহবিল কখনোই খরচ করা হবে না। বরং এই তহবিল বিনিয়োগের মাধ্যমে যে লভ্যাংশ পাওয়া যাবে তা স্ট্যান্ডিং কমিটিকে প্রদান করা হবে তাদের কার্যক্রম পরিচালনার জন্য। একই সাথে তহবিলের বিনিয়োগ ও পরিচালনার দায়িত্ব প্রদান করা হয় স্থায়ী কমিটির ওপর। এরপর থেকে সেভাবেই চলছে, তহবিল বিনিয়োগের মাধ্যমে প্রতি বছর যে লভ্যাংশ আসছে তা দিয়ে চলছে সংগঠনের কার্যক্রম। অতিরিক্ত খরচের প্রয়োজন হলে সংগঠনের সদস্যরা তাদের সামর্থ্য অনুযায়ী বহন করেন, কোনো কোনো সময় এগিয়ে আসেন শুভাকাক্সক্ষীরাও।

সংগঠনের কার্যক্রম শুরুতে কৃতি শিক্ষার্থীদের সংবর্ধনা প্রদানর মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল। ধীরে ধীরে এর সাথে যুক্ত হয়েছে গুণীজনদের সংবর্ধনা প্রদান, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, সাধারণ জ্ঞানের প্রতিযোগিতা এবং ম্যাগাজিন প্রকাশনা। লক্ষ্য আছে- বিতর্ক প্রতিযোগিতা, উপস্থিত বক্তৃতা, আবৃত্তি প্রতিযোগিতা, চিত্রাঙ্কন প্রতিযোগিতাসহ নানা রকম সৃজনশীল আয়োজনকে সংগঠনের কার্যক্রমের আওতায় নিয়ে আসার। পাশাপাশি আধুনিক প্রযুক্তি সমৃদ্ধ একটি পাঠাগার প্রতিষ্ঠারও স্বপ্ন আছে। যাতে বিপুল সংখ্যক বইয়ের পাশাপাশি শিক্ষার্থীরা পাবে বিনামূল্যে ইন্টারনেট ব্যবহার করে পড়াশোনার সুযোগ। স্বপ্ন থাকলেও আমাদের সাধ্য সীমিত। তবু আমরা স্বপ্ন দেখি, এলাকার শিক্ষার্থীদের মননশীলতা বিকাশে যা যা করণীয় একদিন তার সব কিছুই করা সম্ভব হবে ‘ফরমার স্টুডেন্ট অ্যাসোসিয়েশন অব গুলশাখালী’র পক্ষ থেকে। 

No comments:

Post a Comment