হোসেন মাহমুদ
কখনো কখনো মানুষের জীবনে এ রকম কোনো ঘটনা ঘটে যা তার জীবনকে একেবারে বদলে দেয়। তখন তার অন্তরের গভীরে এমন একটি উপলব্ধি জন্ম নেয় যা পরে আর কিছুতেই পাল্টায় না। তার বাকি জীবনে সেটাই ছায়া বিস্তার করে থাকে। আমার পুলিশি চাকরি জীবনেও সে রকম একটি ঘটনা ঘটে গেল।
গতরাতের কথা। বৃষ্টি হচ্ছিল। পেট্রোল কারে বসেছিলাম মেপল স্ট্রিট ও থার্ড স্ট্রিটের কোণে। ফ্লাস্ক থেকে কাপে চা ঢেলে ধীরে ধীরে চুমুক দিচ্ছিলাম। মনটা সামান্য উদ্বিগ্ন। সে রাতে আমার মেয়ের পিয়ানো বাজানোর অনুষ্ঠান ছিল। সবে কিশোরী হয়ে উঠেছে সে। অসম্ভব সুন্দর পিয়ানো বাজায়। সে খুব করে চাইছিল যেন আমি সেখানে থাকি। কিন্তু ছুটি পাওয়া সম্ভব ছিল না, তাই তার অনুরোধ রাখতে পারিনি। যদিও খুব করে মাফ চেয়ে নিয়েছি, কিন্তু জানি সে মন খারাপ করবে। এ ভাবনার মুহূর্তেই রেডিওতে মেসেজ এলো- ‘২৩, শেফার্ড স্ট্রিটে ৪২ বছরের এক ব্যক্তি জ্ঞান হারিয়েছেন- শ্বাস-প্রশ্বাস চলছে না তার। একজন অফিসার সেখানে যাওয়া দরকার।’ আমি যেখানে আছি, সেখান থেকে জায়গাটা দূরে নয়। সিদ্ধান্ত নিলাম, আমি যাব, দেখি তার কোনো সাহায্যে যদি আসতে পারি।
আমি সেখানে পৌঁছনোর আগেই বৃষ্টি থেমে গেল। দেখলাম, একটি অ্যাম্বুলেন্স দাঁড়িয়ে আছে। কিছু মানুষ জড়ো হয়েছে বাড়ির সামনের ফুটপাতে। দরজার সামনে যেতেই ভিতর থেকে এক প্যারামেডিক বেরিয়ে এলেন। সাহায্য চাইলেন তিনি। বললেন, অ্যাম্বুলেন্স থেকে স্ট্রেচার ও ব্যাকবোর্ড নামাতে হবে।
সাহায্য করলাম তাকে। বললেন, লোকটির অবস্থা ভালো নয়। তার কথার অর্থ বুঝতে অসুবিধা হলো না।
ঘরে ঢুকে এক মহিলাকে দেখতে পেলাম। টি-শার্ট পরা, ব্যাজে তার নাম লেখা। শার্টের সামনের দিকে স্থানীয় এক রেস্তোরাঁর মনোগ্রাম। ঘরের মধ্যে ছোটবড় পাঁচটি মেয়ে। মনে হলো, আমাকে দেখে অবাক হয়েছে তারা। বছর চারেকের একটি মেয়ে এক কোণে দাঁড়িয়ে। আমাকে দেখে মাথা নাড়ল, হাসল ও হাত নাড়ল। আমিও হাত নেড়ে জবাব দিলাম ও হাসলাম। তারপর সে কোথায় যেন চলে গেল। আমি ভেতরের ঘরে প্রবেশ করলাম। দু’জন প্যারামেডিক রোগীকে চিকিৎসা দিচ্ছিলেন।
রোগীর চেহারা ফ্যাকাশে হয়ে গেছে। নিস্পন্দ। প্যারামেডিকদের চেষ্টায় তিনি কোনো সাড়া দিচ্ছিলেন না। তারা তার ফুসফুস ও শিরায় টিউব ঢোকানোর চেষ্টা করছিলেন। আমার কিছু করার ছিল না। তা জেনেও তাদের সাহায্যে আসতে পারি কিনা জিজ্ঞেস করলাম। তাদের একজন আমাকে ব্যাগটা পাম্প করতে অনুরোধ করলেন, যেখান থেকে ফুসফুসে বাতাস ঢোকানো হচ্ছিল।
একটু পর পাম্প করা বন্ধ করতে বললেন তারা। আমি সেখান থেকে সরে গিয়ে ঘরের মধ্যে নজর দিলাম, অস্বাভাবিক কিছু চোখে পড়ে কিনা। বাইরের ঘরের দিকে তাকালাম। সেই মেয়েটিকে দেখতে পেলাম। সে সব কিছু দেখছিল। অসুস্থ মানুষটি নিশ্চয় তার বাবা। আমার মনে হলো, বাবার এ চিকিৎসা পর্বটি তার না দেখাই ভালো। আমি একজন প্যারামেডিককে বললাম তাকে অন্য ঘরে রেখে আসতে। তিনি তাই করলেন।
প্যারামেডিকরা আরো কয়েক মিনিট চেষ্টার পর রোগীকে দ্রুত ব্যাকবোর্ডে তুলে তারপর স্ট্রেচারে শুইয়ে দিলেন। তাকে এখন হাসপাতালে নিয়ে যাবেন তারা। আমি সে ঘর থেকে বেরিয়ে সামনের ঘরে গেলাম। সেখানে তার স্ত্রীকে দেখতে পেলাম। আমি চাইছিলাম তার স্ত্রীও যেন সঙ্গে যান। তাকে তা বললে তিনি বললেন, অ্যাম্বুলেন্স তাকে নিয়ে যাক। তিনি গাড়ি চালিয়ে যাবেন। আমি জানতে চাইলাম, তার পরিবারের লোকদের খবর দেব কিনা। কারণ এই বাচ্চাদের কাছে কারো থাকা দরকার। তিনি বললেন, তারা আসছে। এ সময় তার তেরো বছরের মেয়েটি বলল, সবার দেখাশোনা সেই করতে পারবে।
অ্যাম্বুলেন্স হাসপাতালের উদ্দেশ্যে রওনা হয়ে গেল। স্ত্রী গাড়ি নিয়ে পিছু পিছু রওনা হলেন। একজন প্যারামেডিক রয়ে গেলেন রোগীর ঘরে পড়ে থাকা ব্যবহৃত ওষুধের শিশি, ক্যানিস্টার, স্ট্রিপও কাগজপত্র পরিষ্কার করার জন্য। আমি খুঁজতে থাকলাম সন্দেহজনক কিছু পওযা যায় কিনা। এবং পেয়ে গেলাম। বিছানার একপাশে ভাঁজ করা একটি কাগজ ছিল। খুলে দেখার আগেই মনে হলো, এটা একটা সুইসাইড নোট। দ্রুত হাতে ভাঁজ খুলে সেটা পড়ে ফেললাম। না আমি যা ভেবেছিলাম তা নয়। এটা কোনো এক বাচ্চার আঁকা একটি রেখা চিত্র- একটি মোটা মানুষ, আর কিছু হিজিবিজি লেখা। কোনো সুইসাইড নোট পেলাম না।
শেষ প্যারামেডিক চলে গেলে ঘরে একা রইলাম আমি। করার কিছু নেই। তাই বাইরের ঘরে চলে এলাম। পাঁচটি ছেলেমেয়েই ছিল সেখানে। কিশোরী মেয়েটির কোলে সবচেয়ে ছোট শিশুটি। তার কান্না থামানোর চেষ্টা করছিল সে। কিশোরী জিজ্ঞেস করে-
: বাবা কি বেঁচে আছে?
আমি তার চোখে চোখ রেখে চমকে উঠি। কী যে ভয়ংকর বিষণœতা তার দু’চোখে! বুকের ভেতর মোচড় দিয়ে ওঠে। বলি-
: তোমাকে মিথ্যা কথা বলতে পারব না।
: আপনার কাছ থেকে মিথ্যা শুনতে চাই না।
বললাম-
: তার অবস্থা আমার ভালো মনে হয়নি।
আরেকটি মেয়ে কাঁদছিল। আমি হাঁটু ভাঁজ করে বসার পর দু’জনের উচ্চতা কাছাকাছি হলো। জিজ্ঞেস করিÑ
: কী নাম তোমার?
জবাব আসে-
: শ্যানন।
: কত বয়স?
: আট।
তারপর যা ঘটল সে কথা বলি। সে আমাকে দু’ হাতে জড়িয়ে ধরল। শুধু মা-বাবার মতো একান্ত আপনজনকেই কেউ এভাবে জড়িয়ে ধরে। মনে হলো, আমাকে সে তার আপন মনে করেছে। তাই পরম নির্ভরতা খুঁজছে আমার মধ্যে। কী বলব তাকে? সে মুহূর্তে নিজের মেয়ের কথা মনে হলো। তার তো বাবা আছে। কিন্তু এ মেয়েটি তার বাবাকে আর পাবে না। আমার মেয়েরও যদি এমন হয়? ভাবতে গিয়ে শিউড়ে উঠি।
সে মুহূর্তে আমার মনে হলো, ভুল পেশায় রয়েছি আমি। আমি কে যে এই শিশুগুলোকে সান্ত¡না দেব? তাকিয়ে দেখি, বড় দু’টি মেয়ের চোখ থেকে পানি গড়িয়ে পড়ছে। সবচেয়ে ছোট দু’টি মেয়ে মেঝেতে বসে খেলছে। কী বলব আমি তাদের? বলার আছেই বা কী? তারাও কেউ কিছু বলল না। তারাও জানে না, আমিও জানি না, বাবা বিহীন এ পৃথিবীতে তাদের জন্য কী অপেক্ষা করছে।
এ সময় কে যেন নক করে দরজায়। দেখা গেল পাশের বাড়ির মহিলা। খবর নিতে এসেছেন তিনি। আমি কোনো কথা না বলে চলে আসি।
বাড়ির বাইরে দু’জন প্রতিবেশী দাঁড়িয়েছিল। তারা আমার সাথে কথা বলতে শুরু করে। অপ্রয়োজনীয় কথা। যাকে বলে খাজুরে আলাপ। কিন্তু আমার একেবারেই কথা বলতে ইচ্ছে করছিল না। তারা অসুস্থ লোকটির কথা জানতে চাইল। বললামÑ ভালো নয়। একজন বলল, আপনার ভাব-ভঙ্গি দেখেই আমি আপনার মনের কথা বলে দিতে পারি। কী অদ্ভুত কথা!
পেট্রোল কারে উঠে গাড়ি স্টার্ট দিলাম। দেখলাম গ্যাস চুরির একটা মেসেজ এসেছে। গ্যাস স্টেশনে পৌঁছলে ক্লার্ক বেরিয়ে আসে। উত্তেজিত লোকটি ঘটনার সবিস্তার বর্ণনা শুরু করতেই তাকে থামিয়ে দিয়ে জিজ্ঞেস করি-
: কী পরিমাণ গ্যাস চুরি গেছে?
আমতা আমতা করে লোকটি বলে-
: তা বেশি নয়। চুরি যাওয়া গ্যাসের মূল্য কয়েক ডলার হবে।
ভাবলাম, কি তদন্ত করব! হাতের ময়লার মতো কয়েক ডলার মূল্যের গ্যাস চুরি গেছে। এর মানে হচ্ছে, যে লোকটি গাড়িতে গ্যাস ভরেছে সে মূল্য না দিয়ে চলে গেছে। প্রায় ছিঁচকে চুরির মতো ঘটনা। কে মাথা ঘামায় এই সামান্য ব্যাপারে? তবু ক্লার্ককে বললাম-
: ঠিক আছে, আমি খোঁজ-খবর নিচ্ছি। দেখি, লোকটিকে ধরতে পারি কিনা।
গ্যাস স্টেশনের পিছনে এসে গাড়ি থামিয়ে স্ত্রীকে ফোন করলাম। কিন্তু ফোন ধরে আমার ছেলে। কী ব্যাপার! তার মা কোথায়? খারাপ কিছু ঘটল নাকি? সাঁ করে মাথায় উঠে যায় দুঃশ্চিন্তার পারদ। ছেলেকে বললাম-
: তোমার মা কোথায়? তাকে দাও বাবা।
স্ত্রী ফোন ধরে। কী যে হয় আমার! কেঁদে ফেলি। কোনো কথা না বলে কাঁদতেই থাকি। সে আমার কান্নার তোড়ে কিছু বলতে পারে না। সে কিছু বলুক আমিও তা চাইছিলাম না। এ অবস্থায় একজন মানুষ কিইবা বলতে পারে। স্ত্রী কিছু বলার সুযোগও পাচ্ছিল না। আমি কাঁদতেই থাকি। আমার চোখে চারটি ছোট মেয়ে ও শিশুটির মুখ ভেসে ওঠে। আমি যেন শ্যাননের জড়িয়ে ধরার স্পর্শ পাই। আমার চোখ থেকে অশ্রু ঝরতে থাকে। পুলিশ রেডিও বন্ধ করে দেই। এদিকে আবার বৃষ্টি নামে। গাড়ির কাচে, অ্যাসফল্টের রাস্তায় বৃষ্টির প্রবল বেগ শব্দ তোলে। এ অবস্থায় আমার কান্না কেউ দেখতে পাবে না। আরো কিছুটা পর কান্না থেমে আসে। স্ত্রীকে বলি, আমার এখন অফিসে যাওয়া দরকার। যাচ্ছি। সে বলে, দরকার নেই। বাড়ি চলে এসো, বিশ্রাম নাও। তার কথা শোনা সম্ভব নয় বলে ফোন রেখে দেই।
অফিসে ফিরে যাই। মাথা থেকে অস্বস্তিকর বোধটি ঝেড়ে ফেলার জন্য কাজে মনোযোগ নিবদ্ধ করি। গ্যাস চোর লোকটিকে খুঁজে বের করতে ইনফরমার লাগিয়ে দেই। তার সন্ধান পেতেই হবে।
তারপর পেট্রোল কার নিয়ে আবার রাস্তায় নেমে আসি। গতিসীমা ভঙ্গকারীসহ ট্রাফিক আইন লংঘনের কিছু ঘটনা চোখে পড়লেও পাত্তা দিলাম না। মনে হচ্ছিল, পৃথিবীতে যা খুশি ঘটে ঘটুক। তাতে আমার কী! আমার মন ভালো নেই।
ডিউটি সময় শেষ। বাড়ি ফেরার আগে হাসপাতালে গেলাম। জানতে পারলাম, লোকটির হার্টবিট পাওয়া গেছে, কিন্তু তার শ^াস চলছে না। লাইফ সাপোর্টে রাখা হয়েছে তাকে। তার মানে আশা নেই।
জীবনটা হলো কচু পাতার উপর জমে থাকা পানির মতো। একটু ঝাঁকি দিলেই পানি গড়িয়ে পড়বে। কিংবা পানি ভরা গ্লাসে বরফের টুকরোর মতো। খানিক পরই বরফ গলে পানিতে মিশে যাবে। আর খুঁজে পাওয়া যাবে না।
ঐ বাচ্চা মেয়েগুলোকে দেখার পর আমার জীবনের সব কিছু পাল্টে গেছে। আমি জানি, আমি আর কখনোই আগের মতো হতে পারব না।
[ইংরেজি ভাষায় লেখা ‘এ ক্রিটিক্যাল মোমেন্ট’ শীর্ষক গল্পের ভাবানুবাদ এই ‘পরিবর্তন’। এর মূল লেখক মার্ক এস. ডেকার, ১৯৬৫ সালে যুক্তরাষ্ট্রের মিসৌরি অঙ্গরাজ্যের ফেস্টাসে জন্মগ্রহণ করেন। ইন্টারনেটে ছোটগল্প লিখে তিনি পাঠকদের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছেন।]
হোসেন মাহমুদ: সাংবাদিক, প্রাবন্ধিক এবং অনুবাদক।
কখনো কখনো মানুষের জীবনে এ রকম কোনো ঘটনা ঘটে যা তার জীবনকে একেবারে বদলে দেয়। তখন তার অন্তরের গভীরে এমন একটি উপলব্ধি জন্ম নেয় যা পরে আর কিছুতেই পাল্টায় না। তার বাকি জীবনে সেটাই ছায়া বিস্তার করে থাকে। আমার পুলিশি চাকরি জীবনেও সে রকম একটি ঘটনা ঘটে গেল।
গতরাতের কথা। বৃষ্টি হচ্ছিল। পেট্রোল কারে বসেছিলাম মেপল স্ট্রিট ও থার্ড স্ট্রিটের কোণে। ফ্লাস্ক থেকে কাপে চা ঢেলে ধীরে ধীরে চুমুক দিচ্ছিলাম। মনটা সামান্য উদ্বিগ্ন। সে রাতে আমার মেয়ের পিয়ানো বাজানোর অনুষ্ঠান ছিল। সবে কিশোরী হয়ে উঠেছে সে। অসম্ভব সুন্দর পিয়ানো বাজায়। সে খুব করে চাইছিল যেন আমি সেখানে থাকি। কিন্তু ছুটি পাওয়া সম্ভব ছিল না, তাই তার অনুরোধ রাখতে পারিনি। যদিও খুব করে মাফ চেয়ে নিয়েছি, কিন্তু জানি সে মন খারাপ করবে। এ ভাবনার মুহূর্তেই রেডিওতে মেসেজ এলো- ‘২৩, শেফার্ড স্ট্রিটে ৪২ বছরের এক ব্যক্তি জ্ঞান হারিয়েছেন- শ্বাস-প্রশ্বাস চলছে না তার। একজন অফিসার সেখানে যাওয়া দরকার।’ আমি যেখানে আছি, সেখান থেকে জায়গাটা দূরে নয়। সিদ্ধান্ত নিলাম, আমি যাব, দেখি তার কোনো সাহায্যে যদি আসতে পারি।
আমি সেখানে পৌঁছনোর আগেই বৃষ্টি থেমে গেল। দেখলাম, একটি অ্যাম্বুলেন্স দাঁড়িয়ে আছে। কিছু মানুষ জড়ো হয়েছে বাড়ির সামনের ফুটপাতে। দরজার সামনে যেতেই ভিতর থেকে এক প্যারামেডিক বেরিয়ে এলেন। সাহায্য চাইলেন তিনি। বললেন, অ্যাম্বুলেন্স থেকে স্ট্রেচার ও ব্যাকবোর্ড নামাতে হবে।
সাহায্য করলাম তাকে। বললেন, লোকটির অবস্থা ভালো নয়। তার কথার অর্থ বুঝতে অসুবিধা হলো না।
ঘরে ঢুকে এক মহিলাকে দেখতে পেলাম। টি-শার্ট পরা, ব্যাজে তার নাম লেখা। শার্টের সামনের দিকে স্থানীয় এক রেস্তোরাঁর মনোগ্রাম। ঘরের মধ্যে ছোটবড় পাঁচটি মেয়ে। মনে হলো, আমাকে দেখে অবাক হয়েছে তারা। বছর চারেকের একটি মেয়ে এক কোণে দাঁড়িয়ে। আমাকে দেখে মাথা নাড়ল, হাসল ও হাত নাড়ল। আমিও হাত নেড়ে জবাব দিলাম ও হাসলাম। তারপর সে কোথায় যেন চলে গেল। আমি ভেতরের ঘরে প্রবেশ করলাম। দু’জন প্যারামেডিক রোগীকে চিকিৎসা দিচ্ছিলেন।
রোগীর চেহারা ফ্যাকাশে হয়ে গেছে। নিস্পন্দ। প্যারামেডিকদের চেষ্টায় তিনি কোনো সাড়া দিচ্ছিলেন না। তারা তার ফুসফুস ও শিরায় টিউব ঢোকানোর চেষ্টা করছিলেন। আমার কিছু করার ছিল না। তা জেনেও তাদের সাহায্যে আসতে পারি কিনা জিজ্ঞেস করলাম। তাদের একজন আমাকে ব্যাগটা পাম্প করতে অনুরোধ করলেন, যেখান থেকে ফুসফুসে বাতাস ঢোকানো হচ্ছিল।
একটু পর পাম্প করা বন্ধ করতে বললেন তারা। আমি সেখান থেকে সরে গিয়ে ঘরের মধ্যে নজর দিলাম, অস্বাভাবিক কিছু চোখে পড়ে কিনা। বাইরের ঘরের দিকে তাকালাম। সেই মেয়েটিকে দেখতে পেলাম। সে সব কিছু দেখছিল। অসুস্থ মানুষটি নিশ্চয় তার বাবা। আমার মনে হলো, বাবার এ চিকিৎসা পর্বটি তার না দেখাই ভালো। আমি একজন প্যারামেডিককে বললাম তাকে অন্য ঘরে রেখে আসতে। তিনি তাই করলেন।
প্যারামেডিকরা আরো কয়েক মিনিট চেষ্টার পর রোগীকে দ্রুত ব্যাকবোর্ডে তুলে তারপর স্ট্রেচারে শুইয়ে দিলেন। তাকে এখন হাসপাতালে নিয়ে যাবেন তারা। আমি সে ঘর থেকে বেরিয়ে সামনের ঘরে গেলাম। সেখানে তার স্ত্রীকে দেখতে পেলাম। আমি চাইছিলাম তার স্ত্রীও যেন সঙ্গে যান। তাকে তা বললে তিনি বললেন, অ্যাম্বুলেন্স তাকে নিয়ে যাক। তিনি গাড়ি চালিয়ে যাবেন। আমি জানতে চাইলাম, তার পরিবারের লোকদের খবর দেব কিনা। কারণ এই বাচ্চাদের কাছে কারো থাকা দরকার। তিনি বললেন, তারা আসছে। এ সময় তার তেরো বছরের মেয়েটি বলল, সবার দেখাশোনা সেই করতে পারবে।
অ্যাম্বুলেন্স হাসপাতালের উদ্দেশ্যে রওনা হয়ে গেল। স্ত্রী গাড়ি নিয়ে পিছু পিছু রওনা হলেন। একজন প্যারামেডিক রয়ে গেলেন রোগীর ঘরে পড়ে থাকা ব্যবহৃত ওষুধের শিশি, ক্যানিস্টার, স্ট্রিপও কাগজপত্র পরিষ্কার করার জন্য। আমি খুঁজতে থাকলাম সন্দেহজনক কিছু পওযা যায় কিনা। এবং পেয়ে গেলাম। বিছানার একপাশে ভাঁজ করা একটি কাগজ ছিল। খুলে দেখার আগেই মনে হলো, এটা একটা সুইসাইড নোট। দ্রুত হাতে ভাঁজ খুলে সেটা পড়ে ফেললাম। না আমি যা ভেবেছিলাম তা নয়। এটা কোনো এক বাচ্চার আঁকা একটি রেখা চিত্র- একটি মোটা মানুষ, আর কিছু হিজিবিজি লেখা। কোনো সুইসাইড নোট পেলাম না।
শেষ প্যারামেডিক চলে গেলে ঘরে একা রইলাম আমি। করার কিছু নেই। তাই বাইরের ঘরে চলে এলাম। পাঁচটি ছেলেমেয়েই ছিল সেখানে। কিশোরী মেয়েটির কোলে সবচেয়ে ছোট শিশুটি। তার কান্না থামানোর চেষ্টা করছিল সে। কিশোরী জিজ্ঞেস করে-
: বাবা কি বেঁচে আছে?
আমি তার চোখে চোখ রেখে চমকে উঠি। কী যে ভয়ংকর বিষণœতা তার দু’চোখে! বুকের ভেতর মোচড় দিয়ে ওঠে। বলি-
: তোমাকে মিথ্যা কথা বলতে পারব না।
: আপনার কাছ থেকে মিথ্যা শুনতে চাই না।
বললাম-
: তার অবস্থা আমার ভালো মনে হয়নি।
আরেকটি মেয়ে কাঁদছিল। আমি হাঁটু ভাঁজ করে বসার পর দু’জনের উচ্চতা কাছাকাছি হলো। জিজ্ঞেস করিÑ
: কী নাম তোমার?
জবাব আসে-
: শ্যানন।
: কত বয়স?
: আট।
তারপর যা ঘটল সে কথা বলি। সে আমাকে দু’ হাতে জড়িয়ে ধরল। শুধু মা-বাবার মতো একান্ত আপনজনকেই কেউ এভাবে জড়িয়ে ধরে। মনে হলো, আমাকে সে তার আপন মনে করেছে। তাই পরম নির্ভরতা খুঁজছে আমার মধ্যে। কী বলব তাকে? সে মুহূর্তে নিজের মেয়ের কথা মনে হলো। তার তো বাবা আছে। কিন্তু এ মেয়েটি তার বাবাকে আর পাবে না। আমার মেয়েরও যদি এমন হয়? ভাবতে গিয়ে শিউড়ে উঠি।
সে মুহূর্তে আমার মনে হলো, ভুল পেশায় রয়েছি আমি। আমি কে যে এই শিশুগুলোকে সান্ত¡না দেব? তাকিয়ে দেখি, বড় দু’টি মেয়ের চোখ থেকে পানি গড়িয়ে পড়ছে। সবচেয়ে ছোট দু’টি মেয়ে মেঝেতে বসে খেলছে। কী বলব আমি তাদের? বলার আছেই বা কী? তারাও কেউ কিছু বলল না। তারাও জানে না, আমিও জানি না, বাবা বিহীন এ পৃথিবীতে তাদের জন্য কী অপেক্ষা করছে।
এ সময় কে যেন নক করে দরজায়। দেখা গেল পাশের বাড়ির মহিলা। খবর নিতে এসেছেন তিনি। আমি কোনো কথা না বলে চলে আসি।
বাড়ির বাইরে দু’জন প্রতিবেশী দাঁড়িয়েছিল। তারা আমার সাথে কথা বলতে শুরু করে। অপ্রয়োজনীয় কথা। যাকে বলে খাজুরে আলাপ। কিন্তু আমার একেবারেই কথা বলতে ইচ্ছে করছিল না। তারা অসুস্থ লোকটির কথা জানতে চাইল। বললামÑ ভালো নয়। একজন বলল, আপনার ভাব-ভঙ্গি দেখেই আমি আপনার মনের কথা বলে দিতে পারি। কী অদ্ভুত কথা!
পেট্রোল কারে উঠে গাড়ি স্টার্ট দিলাম। দেখলাম গ্যাস চুরির একটা মেসেজ এসেছে। গ্যাস স্টেশনে পৌঁছলে ক্লার্ক বেরিয়ে আসে। উত্তেজিত লোকটি ঘটনার সবিস্তার বর্ণনা শুরু করতেই তাকে থামিয়ে দিয়ে জিজ্ঞেস করি-
: কী পরিমাণ গ্যাস চুরি গেছে?
আমতা আমতা করে লোকটি বলে-
: তা বেশি নয়। চুরি যাওয়া গ্যাসের মূল্য কয়েক ডলার হবে।
ভাবলাম, কি তদন্ত করব! হাতের ময়লার মতো কয়েক ডলার মূল্যের গ্যাস চুরি গেছে। এর মানে হচ্ছে, যে লোকটি গাড়িতে গ্যাস ভরেছে সে মূল্য না দিয়ে চলে গেছে। প্রায় ছিঁচকে চুরির মতো ঘটনা। কে মাথা ঘামায় এই সামান্য ব্যাপারে? তবু ক্লার্ককে বললাম-
: ঠিক আছে, আমি খোঁজ-খবর নিচ্ছি। দেখি, লোকটিকে ধরতে পারি কিনা।
গ্যাস স্টেশনের পিছনে এসে গাড়ি থামিয়ে স্ত্রীকে ফোন করলাম। কিন্তু ফোন ধরে আমার ছেলে। কী ব্যাপার! তার মা কোথায়? খারাপ কিছু ঘটল নাকি? সাঁ করে মাথায় উঠে যায় দুঃশ্চিন্তার পারদ। ছেলেকে বললাম-
: তোমার মা কোথায়? তাকে দাও বাবা।
স্ত্রী ফোন ধরে। কী যে হয় আমার! কেঁদে ফেলি। কোনো কথা না বলে কাঁদতেই থাকি। সে আমার কান্নার তোড়ে কিছু বলতে পারে না। সে কিছু বলুক আমিও তা চাইছিলাম না। এ অবস্থায় একজন মানুষ কিইবা বলতে পারে। স্ত্রী কিছু বলার সুযোগও পাচ্ছিল না। আমি কাঁদতেই থাকি। আমার চোখে চারটি ছোট মেয়ে ও শিশুটির মুখ ভেসে ওঠে। আমি যেন শ্যাননের জড়িয়ে ধরার স্পর্শ পাই। আমার চোখ থেকে অশ্রু ঝরতে থাকে। পুলিশ রেডিও বন্ধ করে দেই। এদিকে আবার বৃষ্টি নামে। গাড়ির কাচে, অ্যাসফল্টের রাস্তায় বৃষ্টির প্রবল বেগ শব্দ তোলে। এ অবস্থায় আমার কান্না কেউ দেখতে পাবে না। আরো কিছুটা পর কান্না থেমে আসে। স্ত্রীকে বলি, আমার এখন অফিসে যাওয়া দরকার। যাচ্ছি। সে বলে, দরকার নেই। বাড়ি চলে এসো, বিশ্রাম নাও। তার কথা শোনা সম্ভব নয় বলে ফোন রেখে দেই।
অফিসে ফিরে যাই। মাথা থেকে অস্বস্তিকর বোধটি ঝেড়ে ফেলার জন্য কাজে মনোযোগ নিবদ্ধ করি। গ্যাস চোর লোকটিকে খুঁজে বের করতে ইনফরমার লাগিয়ে দেই। তার সন্ধান পেতেই হবে।
তারপর পেট্রোল কার নিয়ে আবার রাস্তায় নেমে আসি। গতিসীমা ভঙ্গকারীসহ ট্রাফিক আইন লংঘনের কিছু ঘটনা চোখে পড়লেও পাত্তা দিলাম না। মনে হচ্ছিল, পৃথিবীতে যা খুশি ঘটে ঘটুক। তাতে আমার কী! আমার মন ভালো নেই।
ডিউটি সময় শেষ। বাড়ি ফেরার আগে হাসপাতালে গেলাম। জানতে পারলাম, লোকটির হার্টবিট পাওয়া গেছে, কিন্তু তার শ^াস চলছে না। লাইফ সাপোর্টে রাখা হয়েছে তাকে। তার মানে আশা নেই।
জীবনটা হলো কচু পাতার উপর জমে থাকা পানির মতো। একটু ঝাঁকি দিলেই পানি গড়িয়ে পড়বে। কিংবা পানি ভরা গ্লাসে বরফের টুকরোর মতো। খানিক পরই বরফ গলে পানিতে মিশে যাবে। আর খুঁজে পাওয়া যাবে না।
ঐ বাচ্চা মেয়েগুলোকে দেখার পর আমার জীবনের সব কিছু পাল্টে গেছে। আমি জানি, আমি আর কখনোই আগের মতো হতে পারব না।
[ইংরেজি ভাষায় লেখা ‘এ ক্রিটিক্যাল মোমেন্ট’ শীর্ষক গল্পের ভাবানুবাদ এই ‘পরিবর্তন’। এর মূল লেখক মার্ক এস. ডেকার, ১৯৬৫ সালে যুক্তরাষ্ট্রের মিসৌরি অঙ্গরাজ্যের ফেস্টাসে জন্মগ্রহণ করেন। ইন্টারনেটে ছোটগল্প লিখে তিনি পাঠকদের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছেন।]
হোসেন মাহমুদ: সাংবাদিক, প্রাবন্ধিক এবং অনুবাদক।


No comments:
Post a Comment