Thursday, September 28, 2017

আগামীর গ্রাম


ড. তৌফিক এম. সেরাজ
বাংলাদেশ বিশ্বের সবচেয়ে ঘনবসতিপূর্ণ দেশের মধ্যে অন্যতম। বিশ্ব ব্যাংকের তথ্যমতে, ২০১৫ সালে বাংলাদেশের জনসংখ্যার ঘনত্ব প্রতি বর্গকিলোমিটারে ১২০০ জনেরও অধিক; যা ভারতের প্রায় তিন গুণ, পাকিস্তানের প্রায় পাঁচ গুণ এবং চীনের জনসংখ্যার ঘনত্বের আট গুণেরও অধিক। জনসংখ্যার এই উচ্চ ঘনত্বের ফলে মাথাপিছু জমির পরিমাণ কমে দাঁড়িয়েছে মাত্র ০.২১ একর; যা চীনে প্রায় ২.৩ একর এবং ভারতে প্রায় ০.৮ একর। এই বিপুল জনগোষ্ঠির বড় অংশই থাকে গ্রাম এলাকায়। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর তথ্য মতে, ২০১১ সালে বাংলাদেশের মোট জনসংখ্যার প্রায় ৭২ শতাংশ লোক গ্রামে বাস করে।

বিশ্বব্যাংকের তথ্য মতে, ১৯৮০ সালে বাংলাদেশের গ্রামে মোট জনসংখ্যা ছিল ৬ কোটি ৯৪ লক্ষ, যা ২০১৬ সালে বেড়ে দাঁড়ায় ১০ কোটি ৫৮ লক্ষ। বর্ধিত এ জনসংখ্যার চাহিদা মেটাতে গ্রামাঞ্চলে বাড়ি বা ঘরের সংখ্যাও দ্রুত বৃদ্ধি পাচ্ছে। ১৯৭৩ সালে গ্রামাঞ্চলে ঘরের সংখ্যা ছিল ১.১৬ কোটি যা ২০১১ সালে বেড়ে দাঁড়ায় ২.৫৫ কোটিতে। বর্তমানে এর সংখ্যা আরো অনেক বেশি। জনসংখ্যা বেশি হওয়ায় ঘর-বাড়ির সংখ্যা বৃদ্ধির হারও শহরের তুলনায় গ্রামাঞ্চলে বেশি।

বাংলাদেশ মূলতঃ একটি গ্রামপ্রধান দেশ এবং এর অর্থনীতি কৃষিনির্ভর। বিশ্বব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২০১৪ সালে বাংলাদেশের মোট ভূমির ৬৯.৯ শতাংশ ছিল কৃষি জমি, যা দক্ষিণ এশিয়ার যে কোন দেশের তুলনায় সর্বোচ্চ। গ্রামীণ এলাকাতে এত বিশাল এলাকা কৃষি জমি হিসেবে ব্যবহৃত হওয়ায় এবং অন্যদিকে দেশের প্রায় ৭২ ভাগ মানুষ গ্রামে বাস করায় সেখানকার বেশিরভাগ মানুষই জীবিকার জন্য এই কৃষি জমির উপর নির্ভর করে থাকে। যেমন, বাংলাদেশের মোট শ্রমিক জনগোষ্ঠির ৪৫ ভাগই এই কৃষি পেশায় নিয়োজিত। অর্থাৎ বিশ্বব্যাংকের হিসাব অনুযায়ী বাংলাদেশের ৭৩.৮৭ মিলিয়ন মানুষ শ্রমিক, যা সংখ্যার দিক থেকে বিশ্বের অন্যান্য দেশের তুলনায় অষ্টম। আর ৪৫ ভাগ শ্রমিকই কৃষি পেশার উপর নির্ভরশীল। অন্যভাবে বলতে গেলে বলতে হয়, কেবল এই ৪৫ শতাংশ শ্রমজীবী মানুষই নয়, তাদের পরিবারও জীবিকার জন্য এই কৃষির উপর নির্ভর করছে।
ক্রমবর্ধমান গ্রামীণ জনসংখ্যার বাসস্থানের চাহিদা মেটাতে গিয়ে তৈরি হচ্ছে নতুন নতুন ঘর-বাড়ি। গ্রামাঞ্চলে ঘর সাধারণত উলম্ব (vertical) সম্প্রসারণ না হয়ে আনুভূমিক (horizontal) বরাবর বৃদ্ধি পেয়ে থাকে। অর্থাৎ, নতুন আবাসস্থল তৈরি করার জন্য আবাদযোগ্য কৃষিজমিকে নতুন আবাসস্থলে পরিণত করা হচ্ছে। আনুভূমিক বরাবর অপরিকল্পিতভাবে বৃদ্ধি পাবার ফলে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয় কৃষি জমি। অপরিকল্পিতভাবে কৃষি জমি ধ্বংস করেই অধিকাংশ ক্ষেত্রে বাসস্থান নির্মাণ করা হয়ে থাকে। National Food Policy Capacity Strengthening Programme-এর তথ্য মতে, বিগত ৩০-৪০ বছর ধরে বাংলাদেশে কৃষি জমি গড়ে ১ শতাংশ হারে নষ্ট হচ্ছে। অর্থাৎ উল্লেখিত সময়ে বাংলাদেশের প্রায় এক চতুর্থাংশ কৃষি জমি ধ্বংস হয়েছে। বাংলাদেশ ব্যুরো অব স্ট্যাটিসটিকস এর তথ্য মতে, ১৯৮৫-৮৬ সাল থেকে ২০০৬-০৭ সাল পর্যন্ত বাংলাদেশের মোট চাষযোগ্য জমি কমেছে প্রায় ১১ শতাংশ। কৃষি মন্ত্রণালয়ের হিসাব অনুযায়ী, বর্তমানে বাংলাদেশের প্রায় ৮৪.৪ লক্ষ হেক্টর চাষযোগ্য জমি রয়েছে। যদি বর্তমান ১ শতাংশ হারে চাষযোগ্য জমি কমতে থাকে, তবে ২০২০ সালে এর পরিমাণ দাঁড়াবে কেবল ৭০ লক্ষ হেক্টরের কিছু বেশি (ডেইলি স্টার, অক্টোবর ১৬, ২০১০)।
অপরদিকে, আমাদের গ্রামীণ এলাকার উন্নয়ন কিছুটা ছড়ানো-ছিটানো ধরনের। এই বিচ্ছিন্ন উন্নয়নের কারণে বসতবাড়িগুলোকে সংযোগ করতে গিয়ে প্রয়োজন পড়ে প্রচুর রাস্তার, যা দখল করে নিচ্ছে বিশাল পরিমাণের কৃষিজমি। পাশাপাশি প্রতিদিনের জীবনযাত্রার জন্য প্রয়োজনীয় সুযোগ-সুবিধা যেমন- স্কুল, হাসপাতাল, মার্কেট, গণপরিবহন ইত্যাদি প্রদান করা হয়ে পড়ছে খুবই দুরহ এবং ব্যয়বহুল। একজন দরিদ্র গ্রামবাসীর পক্ষে এই ব্যয়বহুল সুবিধার কার্যকর ফল লাভ করা আরও বেশি দুরূহ। ক্রমশ কমে যাওয়া কৃষিজমি কমিয়ে দিচ্ছে গ্রামের প্রান্তিক কৃষকদের কাজের ক্ষেত্র এবং ব্যয়বহুল জীবন তাদের ঠেলে দিচ্ছে অনভ্যাসের শহুরে জীবনের দিকে। কৃষি মৌসুম ছাড়া অন্য সময়ে কাজের আশায় তারা ছুটছে শহরের দিকে। এ অবস্থায় ক্রমবর্ধমান জনসংখ্যার চাপ এবং কৃষিজমির সুরক্ষা নিশ্চিত করার লক্ষ্যে পল্লী এলাকার উন্নয়ন সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। শুধুমাত্র শহরের উন্নয়ন দ্বারা পুরো দেশের মানুষের ভাগ্য এবং অর্থনীতির স্বরূপ পরিবর্তন করা কঠিন।
বর্তমানের কৃষিজমির বা বাসস্থানের এই সংকট উত্তরণের জন্য প্রয়োজন একটি সামগ্রিক পরিকল্পনা। গ্রামীণ বসতির নবরূপ দিতে হলে আমাদের প্রথমেই পরিকল্পনা পদ্ধতি নির্ধারণ করতে হবে। দুর্বল পরিকল্পনা পদ্ধতির কারণে অতীতে আমাদের বেশিরভাগ উদ্যোগ সফল হয়নি। এখানে গ্রামীণ সমাজব্যবস্থা, পরিবেশ, কৃষিকাজ, মৎস্য চাষ ইত্যাদিকে গুরুত্ব দিয়ে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা প্রণয়ন করা প্রয়োজন। উন্নত পরিকল্পনা এবং এর সঠিক বাস্তবায়নসহ সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনা প্রয়োজন। এ বিষয়ে শিক্ষাবিদ, অর্থনীতিবিদ, পেশাজীবী অনেকেই বাংলাদেশের পল্লী অঞ্চলে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে গড়ে ওঠা বসতির পরিবর্তে সুবিন্যস্ত এবং পরিকল্পিত ও বহুতলবিশিষ্ট গ্রামীণ আবাসনের প্রস্তাব করেন। বহুতল ভবন বলতে গ্রাম এলাকায় সাধারণত ৩ থেকে ৫ তলা ভবন বুঝানো হয়েছে। এসব ভবনে গ্রামীণ পরিবেশ বজায় রাখার জন্য নির্মাণ ব্যয় সীমিত রাখার জন্য এসব ভবনে কোন লিফট বা জেনারেটর রাখা হবে না। ভবন নির্মাণের ক্ষেত্রে দেশীয় প্রযুক্তির ইট অথবা ফাঁপা সিমেন্টের ব্লক ব্যবহার করা যেতে পারে; যা ভবন নির্মাণ ব্যয় লক্ষ্যণীয়ভাবে কমিয়ে নিয়ে আসবে। আমাদের গ্রামাঞ্চল সৌরবিদ্যুৎ ব্যবহারে বর্তমানে অনেক সফলতা অর্জন করেছে। এবং গ্রাম এলাকায় সূর্যের আলোর প্রাচুর্যতাকে কাজে লাগানো সম্ভব হলে সৌরবিদ্যুতের ব্যবহার বৃদ্ধির মাধ্যমে পুরো দেশে বিদ্যুতের ক্রমবর্ধমান চাহিদা মোকাবেলা করা সম্ভব হবে। এসব আবাসনে পরিকল্পিতভাবে বিন্যস্ত অ্যাপার্টমেন্ট এবং বসতবাড়ির পাশাপাশি হাসপাতাল, স্কুল, কলেজ, হাটবাজার, গ্রামীণ শিল্পকারখানা, স্থানীয় সরকারি ব্যবস্থা এবং সব ধরনের নাগরিক সুযোগ-সুবিধা থাকবে। এই গ্রামীণ আবাসনগুলো নিজস্ব অর্থায়নে নির্মিত হবে এবং স্বনির্ভর হবে। স্বল্প জায়গায় আবাসিক সুবিধা তৈরি করায় আবাসিক এলাকাকে যান্ত্রিক যানবাহন মুক্ত রাখা সম্ভব হবে, যা পরিবেশবান্ধব বসতি গড়ে তোলায় সহায়ক হবে। আয়তন ছোট হওয়ায় মূলতঃ অযান্ত্রিক যানবাহন হবে মানুষের চলাচলের অন্যতম মাধ্যম।
উপযুক্ত পরিকল্পনার মাধ্যমে গ্রামীণ এলাকায় যদি বহুতলবিশিষ্ট বসতি সৃষ্টি করা যায়, তাহলে কৃষিজমির ওপর আগ্রাসন শুধু কমবেই না, বরং নতুন করে আরও কিছু কৃষিজমি মুক্ত হবে। আবাসিক এলাকাগুলো একজায়গায় ঘন সন্নিবিষ্ট হওয়ায় বর্তমানের কৃত্রিম বেড়িবাঁধের ধারণা থেকে বের হয়ে আসা যাবে, যা জলোচ্ছ্বাস ও বন্যার প্রকোপে ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ কমাবে। নিয়মিত নদীর পানির বয়ে নিয়ে আসা পলি কৃষিজমিকে করবে আরো উর্বর। যা খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জনের পাশাপাশি আমাদের অর্থনীতিকে করবে শক্তিশালী।
এ ছাড়া এখানে বিভিন্ন নগর সুবিধাদি বিদ্যমান থাকবে। সুতরাং পল্লী থেকে নগরে মানুষের স্থানান্তর হ্রাস পাবে এবং এর ফলে আঞ্চলিক বৈষম্যও কমে যাবে। অবকাঠামোগত উন্নয়ন এবং নাগরিক সুযোগ-সুবিধাদি যেমন রাস্তাঘাট, বিদ্যুৎ, স্কুল, কলেজ, হাসপাতাল প্রভৃতি প্রদান করার ক্ষেত্রে বিশেষ সুবিধা হবে। এ ধরনের উদ্যোগে সমবায়ের মাধ্যমে কৃষিকাজ, মৎস্য চাষ, গবাদি পশু ও হাঁস-মুরগি পালন করে গ্রামের অধিবাসীদের আয় বাড়ানো যেতে পারে।
পরিকল্পিত কিছু গ্রামীণ এলাকা তৈরির প্রচেষ্টা হিসেবে বাংলাদেশ সরকার বেশ কিছু প্রকল্পের উদ্যোগ গ্রহণ করেছিল। ১৯৮৮ সালে সরকার গুচ্ছগ্রাম নামে এক প্রকল্প হাতে নেয়, যার মূল লক্ষ্য ছিল গৃহহীনদের পুনর্বাসন। এ প্রকল্পের অধীনে ৭৫০টি আদর্শ গ্রাম প্রতিষ্ঠা করা হয়। প্রকল্পের আওতায় প্রত্যেক পরিবারকে একটি থাকার ঘর, একটি রান্নাঘর, একটি উন্নত পায়খানা এবং কিছু কৃষিজমি প্রদান করা হয়। পরবর্তীতে ১৯৯১ সালে প্রকল্পের নাম পরিবর্তন করে ‘আদর্শ গ্রাম’ নামে যাত্রা শুরু করা হয়। এ প্রকল্পের অধীনে সকল ধরনের নাগরিক সুবিধাসম্পন্ন স্বল্প দূরত্বে ৮টি আদর্শ গ্রাম প্রতিষ্ঠা করা হয়। কিন্তু এ সকল উদ্যোগই ছিল প্রয়োজনের তুলনায় অপ্রতুল। এ প্রকল্পগুলোতে একটি পরিকল্পিত গ্রামের কথা চিন্তা করা হয় কিন্তু যথোপযুক্ত সমন্বয়ের অভাবে এই প্রক্রিয়া স্থায়ী হয়নি এবং আশানুরূপ সফলতা বয়ে আনতে পারেনি। অপরদিকে শুধুমাত্র আনুভূমিক বরাবর উন্নয়ন জনসংখ্যার বৃদ্ধির সাথে তাল মিলিয়ে দীর্ঘমেয়াদি কার্যকর সফলতা নিয়ে আসতে পারবে না। এর পরিবর্তে বহুতল ভবনের পরিকল্পনা আজকের বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে ভীষণ জরুরি।
একদিকে বর্ধিত জনসংখ্যার চাপ অন্যদিকে ক্রমহ্রাসমান কৃষিজমি থেকে খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণতার লক্ষ্য অর্জন আজকের বাংলাদেশের জন্য অন্যতম বড় প্রতিবন্ধকতা। তাই নতুন পরিকল্পনার মাধ্যমে এই দ্বিমুখী চাপ উত্তোরণের জন্য আমাদের বহুতল ভবনের মতো উদ্যোগের উপর গুরুত্ব আরোপ করা দরকার। এবং বহুতল ভবন নির্মাণের ক্ষেত্রে ব্যয়সাশ্রয়ী টেকসই প্রযুক্তি ব্যবহারে আমাদের আরো সচেতন হওয়া প্রয়োজন। সর্বোপরি এ ধরনের উদ্যোগের ক্ষেত্রে আমাদের গ্রামীণ এলাকার সমাজব্যবস্থা, জীবনব্যবস্থা, আর্থসামাজিক পরিবেশ, সামাজিক শ্রেণি প্রভৃতি বিষয় মাথায় রাখা প্রয়োজন। আমাদেরকে পরিবেশগত প্রভাব, বাস্তুসংস্থান এবং সামাজিক জীবনের উপর দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব বিশ্লেষণ করতে হবে। এই সকল বিষয়কে বিবেচনায় রেখে আমাদের ভবিষ্যৎ সকল উন্নয়নের ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নিতে হবে।

তৌফিক এম. সেরাজ: প্রকৌশলী ও পরিকল্পনাবিদ, ব্যবস্থাপনা পরিচালক, শেল্টেক্ (প্রা.) লি.।

No comments:

Post a Comment