Monday, October 2, 2017

বটের তলায় ঝটাঋষি

ড. মোহাম্মদ আমীন
অনেকদিন আগের কথা। বদল বাড়ির কাজির দীঘির পাড়ে একটি গাছ ছিল। ছোটো বলে সে ছিল নিরীহ। বড়ো বড়ো গাছেরা তার সাথে কথ বলত না। সবসময় উপহাস করত।
মজা করে বলতো,  চুনোপুঁটি।

চুনোপুঁটি ডাক শুনলে তার নরম ডালগুলো দুঃখ পেত। এজন্য চুনোপুঁটি গাছ সবসময় কান চেপে ধরত।
চুনোপুঁটি কান চেপে ধরলে বড়োরা গলার আওয়াজ আরও বাড়িয়ে দিয়ে বলত,
চুনোপুঁটি চুনোপুঁটি
তুলে নেব মুটি মুটি।
এটি শুনে চুনোপুঁটি কাঁদত। তখন বড়ো বড়ো গাছগুলো আরও বেশি মজা করে বলত,
        চুনোপুঁটি কাঁদছে
        মনে বুঝি লাগছে।

চুনোপুঁটি গাছ কাউকে আঘাত করত না। পাখিরা তার পাতায় বাসাবেঁধে গান গাইত।
    আমার পাখি কিচির মিচির
     দেখব ভোরে সাদা শিশির।

একদিন চুনোপুঁটি গাছের নিচে এক জটাধারী ঋষি এসে আরাধনা শুরু করলেন। ঋষির মুখের দাড়ি দেখলে মনে হতো বাঁশঝাড়। মুচগুলো মাটিতে গড়াগড়ি খেত।
মাথায় হাজার হাজার জটা। দেখলে মনে হতো, ঝাউবন।

চুনোপুঁটি গাছ ঋষিকে পাতা দিয়ে বাতাস করত। গরমকালে ছায়া দিয়ে শীতল রাখত। ফলমূল খেতে দিত। পাখিদের মল ছোটো ছোটো পাতা দিয়ে আটকে দিত। যাতে ঋষির গায়ে না-পড়ে।

শীতকালে ঋষি শীতে কাঁপত। চুনোপুঁটি গাছ শুকনো পাতা দিয়ে ঋষিকে চাদর বানিয়ে পরিয়ে দিত।
অনেকদিন সে ঋষিকে এভাবে সেবা করে আসছিল।
একদিন ঋষির আরাধনা শেষ হয়ে এল।

যাবার দিন ঋষি চুনোপুটিকে বলল, আমি তোমার সেবায় খুশি হয়েছি। তোমাকে বর দেব। তুমি কী চাও?
চুনোপুঁটি বলল, আমি ছোটো। সবাই আমাকে চুনোপুঁটি ডাকে। আমাকে আকাশের মতো বিশাল করে দিন।
ঋষি বলল, তাই হবে।

চুনোপুঁটি বলল, আমার ফলগুলো মারবেলে মতো ছোটো। দেখলে শরম করে। আমার ফলগুলো পাথরের মতো মজবুত এবং ফুটবলের মতো বড়ো করে তার ভেতর মধু ভরে দিন।

ঋষি বলল, তাই হবে। আজ থেকে তোমাকে কেউ চুনোপুঁটি ডাকবে না। তোমার নাম দিলাম বটগাছ।
চুনোপুঁটি বলল, বটগাছ মানে কী?
ঋষি বলল, বটগাছ মানে বিশাল বড়ো গাছ।
চোখের পলকে চুনোপুঁটি বিশাল হয়ে গেল।
তার মাথা সবগাছের উপরে। তবে সে দাঁড়াতে পারছিল না। কলা পাতার মতো কাঁপছিল।
ঋষি বলল, তুমি কাঁপছ কেন?
বট বলল, আমি দাঁড়াতে পারছি না। আমার শেকড়গুলো নরম ও চিকন।
ঋষির বর শেষ হয়ে গেছে। এখন কী করা যায়? শেকড় না পেলে এত বড়ো গাছ ভেঙে পড়বে। ঋষির মাথায় হাজার হাজার জটা ছিল। ঋষি তাঁর মাথা থেকে কয়েক হাজার জটা খুলে বটগাছের শেকড়ে পরিয়ে দিলেন।
বটগাছ এবার দাঁড়াতে পারল। ঋষি চোখের পলকে হাওয়ায় মিলিয়ে গেলেন।

চুনোপুঁটি এখন বট। বিশাল আয়তন। কী চমৎকার পাতা! পাতা ছিঁড়লে ডগা থেকে সাদা দুধ আসে।
ডালপালা আকাশের বিরাট অংশ ঢেকে দিয়েছে। চারিদিক ছায়ায় ছায়ায় শীতল।
বটের বিশাল শরীর, চমৎকার ফুল। এক একটা ফল যেন ফুটবল।

কয়েকদিনের মধ্যে বটগাছের সুনাম ছড়িয়ে পড়ল। এখন কেউ তাকে চুনোপুঁটি ডাকে না। ডাকে বটহুজুর।
বটের শরীর আকাশে আর শেকড় পাতালে গিয়ে পৌঁছেছে। এবার অহংকারে বট আকাশকেও অবহেলা করতে শুরু করল। ফলগুলো পেকে পাথরের মতো মজবুত হয়ে গেছে। এই দেখে বটের অহংকার আরও বেড়ে গেল।

সে পাথরের মতো কঠিন আর বেলুনের মতো বড়ো বড়ো ফল মাটিতে ছুড়ে দিতে শুরু করল। ফল পড়ে অনেকের মাথা আর হাত-পা ভেঙে গেল।
তাদের দুঃখ দেখে বটগাছ হাসত।

বটফলের আঘাতের ভয়ে সবাই ভীত হয়ে পড়ল। কেউ ওদিক দিয়ে যেতে পারত না। গেলে বট তার মাথায় পাথরের মতো মজবুত ফল ছুড়ে মাথা ভেঙে দিত।

একদিন ঋষি বটগাছকে দেখার জন্য এলেন। বটগাছের শানশওকত দেখে ঋষি খুব খুশি।
বটের গায়ে হাত বুলিয়ে বললেন, তুমি কেমন আছ?
বট মুখ ভেংচিয়ে বলল, কেমন আছি দেখছ না?
আমি বিশাল বট
শাখা আমার লোহার রড।
আমার বড়ো বড়ো ফল
একটা খেলে হবে তোমার বাঘের মতো বল।
ঋষি দুঃখ পেলেন বটের কথায়।
বললেন, তুমি একসময় চুনোপুঁটি ছিলে। আমার মাথার জটায় তুমি দাঁড়িয়ে আছ।
বট বলল, আমি কখনও চুনোপুঁটি ছিলাম না। আমি আমার শেকড়ে দাঁড়িয়ে আছি।

ঋষি কিছু বললেন না। তিনি বটের নিচে বসে আরাধনা শুরু করলেন। একদিন গভীর রাতে বটগাছটি বিশাল একটা ফল ঋষির মাথায় ছুড়ে দিল। ঋষির মাথা ফেটে চৌচির।

ঋষির আরাধনা ভেঙে গেল। তিনি হাঁউমাউ করে কেঁদে উঠলেন।
বট ঋষির দুঃখ দেখে খিল খিল করে হেসে উঠল,
আমার ফল কঠিন পাথর
কারও ভাঙে মাথা, কারও ভাঙে ধড়।

ঋষি বলল, তুমি ফল দিয়ে আমার আরাধনা ভেঙে দিলে কেন?
বটগাছ বলল, আমি যা খুশি তা-ই করব।
ঋষি বলল, এমন করলে আমি কোথায় আরাধনা করব?
বট বলল, আমি কী জানি।

ঋষি বলল, তুমি ছিলে ছোটো। আমি তোমাকে বিশাল আকার দিয়েছি। বড়ো বড়ো ফল দিয়েছি। চমৎকার ফুল দিয়েছি। একসাথে সবকিছু পেয়ে তুমি খুব অহংকারী হয়ে গেছ।  বটগাছ হেসে বলল, অহংকার করার জিনিস আমার আছে। তাই আমি অহংকারী।
ঋষি বলল, তুমি বেয়াদব। তুমি বদমেজাজি।
বট বলল, চুপ করো বুড়া। নইলে ফল ছুড়ে মেরে ফেলব।
ঋষি বলল, সবকিছু পেয়ে তুমি খারাপ হয়ে গেছ। আমি তোমার বিশাল ফলকে মারবেলের মতো ছোটো করে দিলাম। তোমার ফুলের মধু নিয়ে ছোটো গাছেদের ফুলে দিয়ে দিলাম। এখন থেকে তোমার ফল হবে কাকের আহার।

মোহাম্মদ আমীন: যুগ্ম সচিব, জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় এবং প্রধান উদ্যোক্তা, শুদ্ধ বানান চর্চা (শুবাচ)।

No comments:

Post a Comment