আল মামুন ইবনে মিজান
জন্মগতভাবে পশু শিশু ও মানব শিশুর মধ্যে বোধগত প্রার্থক্য নিরূপণ করা যায় না বললেই চলে। একটি বাচ্চা পশু ও একটি মানব শিশুর মধ্যে স্বাভাবিক কিছু একই ধরনের বোধ শক্তি আছে। যেমন নড়াচড়া করা, খাওয়া, মায়ের প্রতি আকর্ষণ- এসব উভয় প্রজাতির শিশুর মাঝে একই রকম। পশুর আচরণ আমৃত্যু একই থাকে কিন্তু মানুষের আচরণ শৈশবে সীমাবদ্ধ থাকে না। প্রতিদিনই মানব শিশুর আচরণের পরিবর্তন হতে হতে এক সময় সে প্রতিক্রিয়াশীল, সৃষ্টিশীল, বিচারবুদ্ধি সম্পন্ন একটি পরিপূর্ণ মানুষে রূপান্তরিত হয়। পশু ও মানুষের মাঝে এই বিভাজনটা কিসে তৈরি করল? এর জবাব মোতাহের হোসেন চৌধুরী অনেক আগেই দিয়ে গেছেন, ‘জীব সত্ত্বার ঘর থেকে মানব সত্ত্বার ঘরে উঠবার মই হচ্ছে শিক্ষা’ মানুষকে মনুষ্যত্বলোকের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেয়াই হচ্ছে শিক্ষার প্রধান কাজ।
সুতরাং সৃষ্টিজগতে বিশাল সৃষ্টিকূলের শ্রেষ্ঠত্বের মুকুটটা মানুষকে এনে দিয়েছে কিন্তু শিক্ষাই। জন্মগতভাবে পশু শিশু ও মানব শিশুর মধ্যে বোধগত প্রার্থক্য নিরূপণ করা যায় না বললেই চলে। একটি বাচ্চা পশু ও একটি মানব শিশুর মধ্যে স্বাভাবিক কিছু একই ধরনের বোধ শক্তি আছে। যেমন নড়াচড়া করা, খাওয়া, মায়ের প্রতি আকর্ষণ- এসব উভয় প্রজাতির শিশুর মাঝে একই রকম। পশুর আচরণ আমৃত্যু একই থাকে কিন্তু মানুষের আচরণ শৈশবে সীমাবদ্ধ থাকে না। প্রতিদিনই মানব শিশুর আচরণের পরিবর্তন হতে হতে এক সময় সে প্রতিক্রিয়াশীল, সৃষ্টিশীল, বিচারবুদ্ধি সম্পন্ন একটি পরিপূর্ণ মানুষে রূপান্তরিত হয়। পশু ও মানুষের মাঝে এই বিভাজনটা কিসে তৈরি করল? এর জবাব মোতাহের হোসেন চৌধুরী অনেক আগেই দিয়ে গেছেন, ‘জীব সত্ত্বার ঘর থেকে মানব সত্ত্বার ঘরে উঠবার মই হচ্ছে শিক্ষা’ মানুষকে মনুষ্যত্বলোকের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেয়াই হচ্ছে শিক্ষার প্রধান কাজ।
ব্যক্তিগত জীবনে আমি একজন শিক্ষক, তবে একথা বলার দুঃসাহস আমার কখনও হয়নি। কাজেই আমি আজও কোথাও বলিনি যে, ‘আমি একজন শিক্ষক’। হ্যাঁ, সব সময়ই বলেছি আমি শিক্ষকতার কাজটা করি, তবে কতটুকু করতে পারি তা নিয়ে যথেষ্ট সংশয়ে থাকি। যেহেতু একাজটায় জড়িত আছি, ফলে কাজটা করতে গিয়ে আমার যে ক্ষুদ্র অনুভূতির জগৎটা তৈরি হয়েছে তাকে অনেক সময়ই তাড়িত করেছে কিছু বিষয়। তাও আবার আমার কাজের যে ক্ষুদ্র অঞ্চল সেই আঞ্চলিক পর্যায়ে, আমি তা নিয়েই আলোচনা করার এই দুঃসাহসিক প্রয়াস চালাচ্ছি; যা সামগ্রীক দেশের জন্য নয়।
মানুষের জীবনটা নির্দিষ্ট একটি সময়ের সমষ্টিমাত্র। আর শিক্ষা হচ্ছে সেই জীবনের সমগ্র সময়ব্যাপী লক্ষ্যমুখী একটি প্রতিক্রিয়া। শিক্ষাকে সংজ্ঞায়িত করতে বিভিন্ন মনীষী বিভিন্ন ধরনের সংজ্ঞা দিয়েছেন, যার সবই কোনো না কোনো দিক থেকে যৌক্তিক ও সঠিক। আমার আলোচনার প্রয়োজনে দু’একটি উল্লেখ করতেই হচ্ছে। শিক্ষা মৌলিকভাবে মানুষের অনুভূতিটাতে প্রথম আঘাত করে। ফলে যার অনুভূতি প্রচ- সে শিক্ষাটাকে গ্রহণ ও কাজে লাগতে সক্ষম হয় যথার্থভাবে। কোনো জীবনই পরিপূর্ণ হয় না, যথার্থ আনন্দবোধ বা কষ্ট ভোগের অনুভূতি ছাড়া, যেটা বিখ্যাত দার্শনিক প্লেটো যথার্থ উপলব্ধি করেছিলেন বলেই তিনি শিক্ষাকে সংজ্ঞায়িত করেছেন এইভাবে, Education is the capacity to feel pleasure and pain is the right moment. অর্থাৎ শিক্ষা হচ্ছে সঠিক মুহুর্তে আনন্দ ও বেদনা অনুভব করতে পারার ক্ষমতা বা শক্তি। আমারা যদি বাস্তব পৃথিবীর দিকে তাকাই তবে এর বাস্তবতা বুঝতে পারি অনায়াসেই। অনুভবের সামর্থ্যে শক্তিমান মানুষেরাই আমাদের সমাজে স্বীকৃত, প্রতিষ্ঠিত, ভালো মানুষ হিসেবে পরিচিত। আর এই অনুভবের ক্ষমতার জন্য অবশ্যই একটি সুস্থদেহ ও মনের প্রয়োজনীয়তা বোধ থেকেই এরিস্ট্যাটল বলতে পেরেছেন, Education is the creation of a sound mind in a sound body. অর্থাৎ সুস্থ দেহে সুস্থ মন তৈরি করার নামই শিক্ষা। এই কাজটি সম্পন্ন করতে হলে আমাদের অবশ্যই কিছু প্রক্রিয়ায় মধ্য দিয়ে যেতে হবে।
শিক্ষা নামক এই লক্ষ্যমুখী প্রতিক্রিয়া নানাভাবে অর্জিত হতে পারে। কোনো প্রাতিষ্ঠানিক প্রক্রিয়ায় না গেলেও শিক্ষা অর্জিত হতে পারে। সে আলোচনায় যাব না, প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা অর্জনে যে প্রতিক্রিয়া অর্জিত হয় আমার আলোচ্য বিষয়টি সেই কেন্দ্রিক। শিক্ষা অর্জনের জন্য সামগ্রীকভাবে শিক্ষা অর্জনের আবহ বা পরিবেশটা সর্বাগ্রে প্রয়োজন; যার অভাব শুধু গ্রাম পর্যায় বা প্রান্তিক পর্যায়েই নয়, বরং আধুনিক শহরেও আছে। একথার পক্ষে-বিপক্ষে অনেক যুক্তি-তর্কই প্রতিষ্ঠিত, আমি সেদিকেও যাব না। আমাদের প্রচলিত প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা অর্জনে চারটি উপাদান একে অপরের পরিপূরক হিসেবে কাজ করে শিক্ষণ কার্যক্রমটাকে পরিপূর্ণতা দান করতে পারে। সেগুলো হচ্ছে- অভিভাবক, শিক্ষার্থী, শিক্ষক ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠান। আমাদের এই লংগদু উপজেলায় এই চারটি উপাদান যথার্থভাবে প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা গ্রহণ ও চূড়ান্ত লক্ষ্যে পৌঁছতে যেসব প্রতিবন্ধকতার সম্মুখীন হয় বা হচ্ছে তা নিয়েই আলোচনার চেষ্টা করব। এই সমস্যাগুলো এমন সমস্যা যা আমরা নিজেরাই তৈরি করছি এবং আমরা ইচ্ছা করলেই এ সমস্যাগুলো পাশ কাটিয়ে অভীষ্ট লক্ষ্যে পৌঁছতে পারি।
অভিভাবক
জীবিকার তাগিদে সদা সংগ্রামরত এখানকার অভিভাবকদের পেশা হচ্ছে- মাছ শিকার, বাঁশ বা গাছ কেটে বিক্রয় করা। ক্ষুদ্রঋণ নিয়ে ক্ষুদ্র ব্যবসা, নৌকা বা মটর সাইকেল চালিয়ে রোজগার করা। এ অঞ্চলের ৯০ শতাংশ লোকই এসব পেশায় জড়িত, যাদের নিজেদের শিক্ষাগত যোগ্যতার ঘর শূন্য, কারো কারো স্কুলে যাওয়ার অভিজ্ঞতা থাকলেও তা বলার মতো পর্যায়ে পড়ে না। কেউ কেউ হয়তো এসএসসি বা এইচএসসি পাশ করে প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক, সেনা, বিজিবি বা আনসার সদস্য। সেই বিবেচনায় তাদের অভিভাবকত্বের স্কেলটাই বলার মতো। এদের বাদ দিলে অবশিষ্ট সিংহভাগ মানুষের অবস্থাটা হচ্ছে, ‘ক্ষুধার রাজ্যে পূর্ণিমার চাঁদকে ঝলসানো রুটি’ ভেবে দিনাতিপাত করায় মগ্ন। এসব অভিভাবক যদিও বা অন্যের দেখাদেখি তাদের সন্তানকে বিদ্যালয়ে পাঠানোর সখ করেন, কিছুদিনের জন্য বিদ্যালয়ে আসা-যাওয়ার ব্যবস্থাটুকু করতে পারলেই নিজেদের শিক্ষানুরাগীর তকমা গায়ে মেখে ফুরফুরে মেজাজে প্রশান্তির ঢেকুর ছাড়েন। কিন্তু বিদ্যালয়ে পাঠানোর পর শিক্ষা প্রক্রিয়ায় শিক্ষার্থীকে উপযোগিতা দেয়া যে তার নিজের কর্তব্য এটা তাদের কর্তব্যের দ্বারে আঘাত করা তো দূরের কথা ছোঁয়াটুকুও লাগাতে পারে না। প্রসঙ্গত বলছি, এসব অভিভাবকদের দোষ নয় বরং অক্ষমতা।
শিক্ষার্থী
প্রথমত একটি পাড়া বা মহল্লায় একজন বা দুজন শিশু অভিভাবকের তাড়নায় বিদ্যালয়ে শিক্ষার আঙ্গিনায় একান্ত বাধ্য হয়ে পা রাখে একটি বিশাল পিছুটান সঙ্গে নিয়ে। সেটি হচ্ছে তার মহল্লার সমবয়সী আরও কমপক্ষে পাঁচজনকে ছেড়ে আসা, যারা তার ঘনিষ্ঠ আত্মীয়-স্বজন বা প্রতিবেশী বন্ধুবান্ধব। এই ছেড়ে আসা বন্ধুবান্ধবদের কেউ রোজগারের ধান্দায় ঘুরছে, কেউ মাঠে খেলছে, কেউ অবাধে ঘুরে বেড়াচ্ছে। অথচ সমবয়সী হয়েও এই এক দু’জন বিদ্যালয়ের কঠোর নিয়ম-শৃঙ্খলায় আবদ্ধ থেকে সকাল ১০টা থেকে বিকাল ৪টা পর্যন্ত বন্দিদশায় তার উদ্দাম খোলা মনটাকে আটকে রাখতে বাধ্য হচ্ছে। (উন্নত বিশ্বের শিক্ষাব্যবস্থা ও পরিবেশ পেলে তাদের এই পিছুটান শিক্ষা বিমুখতা তৈরি করতে পারতো না।) ফলে প্রতিদিন বিদ্যালয়ে আসতে হয়, প্রতিদিনকার পাঠ আয়ত্ত করতে হয়- এই বোধটাই তাদের মাঝে গড়ে ওঠে না। বরং বিভিন্ন অজুহাতে অনুপস্থিত থাকা ও শিক্ষককে ফাঁকি দেওয়ার চর্চায় তারা বেশি সময় ব্যয় করে। এই পরিস্থিতি শুধু তাদের নিজেদেরই ক্ষতি করে না, বরং প্রত্যেক এলাকাতেই বিধাতা প্রদত্ত মেধার অধিকারী অনেক শিক্ষার্থী আছে, যারা প্রতিশ্রুতিশীল ও সুপ্ত প্রতিভার অধিকারী; তাদেরকেও এই ফাঁকির চর্চায় উদ্বুদ্ধ করছে। স্পষ্টতঃ বলার বিষয় হলো, এসব শিক্ষার্থীর জ্ঞান অর্জনের একমাত্র স্থান হচ্ছে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান। বাড়িতে তার জ্ঞানার্জনে বেশি সময় ব্যয় করার পরিবেশ তো নেই-ই, উপরন্তু সে নিজেও এর তাগাদা বোধ করে না। সে বোঝেও না যে তার একমাত্র কাজই হচ্ছে শিক্ষার্জনে সময় ব্যয় করা। ফলে সামগ্রীকভাবে যারা দুর্বল তারা কেউ কোনো মতে পাশ করে আর সংখ্যাগরিষ্ঠই অকৃতকার্যের তালিকায় নাম লিখিয়ে নানা অজুহাতে শিক্ষক, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও শিক্ষা ব্যবস্থাকে দোষারোপ করে। আর যারা মেধাবী তারা অল্পের জন্য ‘জিপিএ ৫’ বঞ্চিত হয়ে একই কায়দায় দোষারোপের পাশাপাশি আফসোস করে আরও কিছু সময় ব্যয় করে। আগেই বলেছি, তাদের বিদ্যালয় আগমন বাধ্য হয়ে, লক্ষ্যহীনভাবে; সুনির্দিষ্ট লক্ষ্য না থাকায় মেধাবীরা যথাযথ ফলাফল অর্জনে চরমভাবে ব্যর্থ হয়। যেনতেনভাবে এসএসসি বা এইচএসসির সার্টিফিকেট অর্জনটা তাদের টার্গেট বানিয়ে অর্জিত ফলাফল দিয়ে অনায়াসে প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক, সামরিক বা আধা সামরিক বাহিনী বা কোনো তৃতীয় বা চতুর্থ শ্রেণির একটি চাকরিই তাদের জীবনের মধ্যগগনের লক্ষ্য স্থির করে সে পথে হাঁটতে হাঁটতে এক সময় তা করায়ত্ত করে জীবনের সব পেয়েছে জ্ঞানে সুখে-শান্তিতে বসবাস শুরু করে। ‘জিপিএ ৫’ বা কাছাকাছি পাওয়া একজন শিক্ষার্থী ভাবেও না যে, সে সৈনিক না হয়ে সেনা অফিসার হতে পারে, পুলিশ সদস্য না হয়ে কর্মকর্তা হতে পারে, প্রাথমিক শিক্ষক না হয়ে কোনো সরকারি কলেজ কিংবা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক হতে পারে। যদিও সম্প্রতি অনেকের এই মানসিকতার পরিবর্তন হচ্ছে এবং তার ফলাফলও কেউ কেউ দৃষ্টান্ত হিসেবে উপস্থাপন করতে সক্ষম হচ্ছে।
শিক্ষক
আধুনিক সভ্য জগতের স্বাভাবিক সুযোগ-সুবিধা বঞ্চিত প্রত্যন্ত অঞ্চল হওয়ায় এখানে শিক্ষক সংকট সবচেয়ে প্রকট, চাহিদা মতো স্থানীয় শিক্ষক যোগাতে অক্ষম এখানকার শিক্ষা ব্যবস্থা প্রায় পুরোটাই বাহিরের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে আগত শিক্ষকদের উপর নির্ভরশীল; যারা এখানে এলেও সুযোগ-সুবিধামত বাইরে কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করে দ্রুত চলে যান। ফলে শিক্ষক সংকট এ অঞ্চলের শিক্ষা ব্যবস্থায় একটি স্থায়ী সমস্যা। যারাও আসেন বা থাকেন তাদের জন্যেও অন্যান্য সমস্যার পাশাপাশি যে সমস্যাটি একজন আধুনিক বিজ্ঞানমনষ্ক যোগ্য ও অভিজ্ঞ শিক্ষক তৈরিতে বাধার স্থায়ী প্রাচীর হয়ে আছে সেটি হলো, যোগাযোগ ব্যবস্থার অপ্রতুলতা এবং আধুনিক তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তির বিচ্ছিন্নতা। এর ফলে অনেক আন্তরিকতাসম্পন্ন শিক্ষক থাকা সত্ত্বেও তারা বিভিন্ন প্রশিক্ষণ কর্মসূচিতে যুক্ত হতে না পেরে নিজেদের দক্ষতা বৃদ্ধির পাশাপাশি আধুনিক ও বিজ্ঞানসম্মত প্রযুক্তিনির্ভর পাঠদান পদ্ধতিগুলো প্রয়োগ করতে পারছেন না। পাশাপাশি ছাত্র-ছাত্রীদের শিক্ষা গ্রহণে উপযোগী ও সহযোগী শিক্ষকের ভূমিকা পালনে ব্যর্থ হচ্ছেন। অথচ বিষয়ভিত্তিক প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত শিক্ষক প্রাপ্তি এখন সময়ের দাবি। এ জাতীয় সুবিধা বঞ্চিত ও সীমাবদ্ধ দক্ষতার অধিকারী শিক্ষকদের মাধ্যমে সু-শিক্ষিত জাতির আকাক্সক্ষা কতটুকু যৌক্তিক?
শিক্ষা প্রতিষ্ঠান
এই উপজেলায় শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা নিতান্তই কম। তাছাড়া ভৌগোলিক কারণেই এমন সব অঞ্চলে ও দূরত্বে অবস্থিত, যেখানে পৌঁছা কোমলমতি শিক্ষার্থীদের জন্য শিক্ষার্জনের সংগ্রামের আগে আরেকটি সংগ্রামে অবতীর্ণ হওয়ার মতো। শহরে ব্যাঙের ছাতার মতো যত্রতত্র শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের অপবাদের সম্পূর্ণ বিপরীত চিত্র এ অঞ্চলে। অর্থাৎ শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে যাওয়ার পরিশ্রম অনেকের শিক্ষাগ্রহণের আগ্রহটাই নষ্ট করে দেয়। প্রতিষ্ঠানের অবকাঠামোগত সুযোগ-সুবিধা তো আরও হতাশাজনক। যেখানে শিক্ষার্থীদের বসার মতো যথার্থ ব্যবস্থাই নেই সেখানে শিক্ষা উপকরণ যেমন- বিজ্ঞানাগার, লাইব্রেরি, পাঠদান সহায়ক অন্যান্য উপকরণ শিক্ষার্থীদের কাছে সাদা কাকের মতই দুর্লভ। বিদ্যালয় ব্যবস্থাপনায় নিয়োজিত ব্যক্তিদের আন্তরিকতার শক্তিটুকু অক্ষমতার দ্বার টপকে যেতেই শেষ হয়ে যায়। ফলে শিক্ষার্থীরা তাদের উপযোগিতা পেতে পেতে বিদ্যালয় ত্যাগের সময় এসে ভুলিয়ে দেয় তাদের সেই প্রতিশ্রুত সুযোগ পাওয়ার কথা।
লেখার শেষ প্রান্তে এসে বলতে চাই, আমার এ লেখা শুধু সমস্যাগুলোকে চিহ্নিত করার ক্ষুদ্র প্রয়াস। তাও আবার আমার মতো একজন অতিক্ষুদ্র জ্ঞানের মানুষের দ্বারা; সেখানে ভুলত্রুটি থাকা স্বাভাবিক। সমস্যাগুলোর বাইরে অনেক ভালো সুবিধা বা গুণাবলিও আছে; যেগুলো আলোচনার অপ্রয়োজনীয়তা ও কলেবর বৃদ্ধির সীমাবদ্ধতায় পরিহার করেছি। সমস্যাগুলোর সমাধান দেয়ার ক্ষমতা আমার নেই, পরামর্শ দেয়ার জ্ঞানের সীমাবদ্ধতাও অলঙ্ঘনীয় নয়। তবুও বলব- অভিভাবক, শিক্ষার্থী ও শিক্ষক এই তিনের যথার্থ সমন্বয় হলেই ফলাফল আসবে, শুধু আসবে না আসবেই। খুলনার এক রিক্সা চালক বাবার তিন ছেলের একজন বিসিএস ক্যাডার, দ্বিতীয়জন মেডিক্যাল শিক্ষার্থী, তৃতীয়জন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যয়নরত। আমরা কি ওই রিক্সা চালককে দেখে অনুপ্রাণিত হতে পারি না? ট্রাকের হেলপার সেই কুড়িগ্রামের বিসিএস ক্যাডার ছেলেটি কি আমাদের একটুও সাহস যোগাতে পারে না? পারে, এর জন্য প্রত্যেক শিক্ষার্থীকে একটি স্থির লক্ষ্য ও উচ্চাকাঙ্ক্ষা নিয়ে অদম্য উদ্দামে পরিশ্রম করে যেতে হবে। যথার্থ শিক্ষাটাকে অর্জন করতে হবে। ফলাফল বড় কথা নয়, যথার্থ অর্জিত শিক্ষা তোমাকে তোমার লক্ষ্যে পৌঁছাবেই। শুধু উঠানের দোষ দিয়ে নাচার অযোগ্যতা ঢাকলে চলবে না।
তোমার সীমাবদ্ধতার দিকে না চেয়ে নিজের আয়োজন নিজে কর প্রকৃতিই তোমার ছবি আঁকার রং, তুলি এগিয়ে দেবে।
পাশাপাশি একজন শিক্ষক যদি শিক্ষার্থীকে মানব সন্তান ভেবে সহযোগিতার হাত উদারভাবে প্রসারিত করেন তবে ফলাফল সুনিশ্চিত। মনে রাখতে হবে, শিক্ষক শিক্ষা দান করেন না বরং শিক্ষাগ্রহণে শিক্ষার্থীকে উৎসাহিত করেন, নিজ সহযোগিতার জ্ঞান ও প্রজ্ঞার মাধ্যমে। শিষ্যের যিনি প্রকৃত গুরু তিনি তার অন্তরেই বিরাজ করেন- এই আপ্ত বাক্যের অনুকরণে একজন শিক্ষক যদি শিক্ষার্থীর প্রতিটি কাজের অনুপ্রেরণার উৎস হতে পারেন তবেই তিনি যথার্থ শিক্ষক। শিক্ষার্থীকেও মনে রাখতে হবে, তার প্রথমপাঠ তার শিক্ষা গুরুর আজ্ঞাপালন।
যদিও অবকাঠামোগত অপর্যাপ্ততা, অর্থায়নের অপ্রতুলতা, শিক্ষা সহায়ক উপযোগিতার সীমাবদ্ধতা, নিম্ন মানের শিক্ষিত ব্যক্তিত্ব তৈরির জন্য দায়ী তথাপি স্বীকার করতেই হবে যে, এই উপজেলায় এমন অনেক প্রতিভাবান শিশুর জন্ম হয় যারা যথার্থ শিক্ষার্জনের মাধ্যমে ভালো রেজাল্ট যেমন করতে পারে, তেমনিভাবে নিজেদের সুপ্ত প্রতিভার উন্মেষ ঘটিয়ে কীর্তিমানের খেতাব অর্জন করতে পারে, পারে নিজ যোগ্যতায় প্রতিদ্বন্দ্বিতার কর্মক্ষেত্রে বড় বড় কর্মকাণ্ডে যুক্ত হয়ে নিজের, সমাজের, জাতির তথা দেশের কল্যাণে ত্রাতার ভূমিকায় অবতীর্ণ হতে। আর এজন্য স্থির লক্ষ্য, অদম্য ও ঐকান্তিক ইচ্ছা, প্রচণ্ড ধৈর্য শক্তি, সততা ও নিষ্ঠার সাথে অবিরাম প্রচেষ্টাই এনে দিতে পারে কাক্সিক্ষত সাফল্য। এরকম একটি ভোরের আকাশ দেখার অপেক্ষায় আছি ২৫টি বছর ধরে। উষা আমাকে আশাজাগাচ্ছে। তাই, আপনি অপলক চেয়ে আছি।
আল মামুন ইবনে মিজান: সহকারী প্রধান শিক্ষক, রাবেতা মডেল উচ্চ বিদ্যালয়।


No comments:
Post a Comment