Saturday, October 7, 2017

টেকসই উন্নয়ন: প্রেক্ষিত পার্বত্য চট্টগ্রাম

আনোয়ার আল হক
একবিংশ শতাব্দীর নতুন নতুন চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করে বিশ্ব এগিয়ে চলেছে দুর্বার গতিতে। এই গতির সাথে পাল্লা দিয়ে এগিয়ে যাচ্ছে বাংলাদেশও। উন্নয়নের মহাসড়কে বাংলাদেশের এগিয়ে চলা অন্য অনেক দেশ থেকে ঈর্ষণীয় এবং তাৎপর্যপূর্ণ। এই শতাব্দীর শুরুতেই বিশ্বের উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা তথা ‘মিলেনিয়াম ডেভেলপমেন্ট গোল’ বা এমডিজি নির্ধারণ করা হয়েছিল। গতির সাথে, চাহিদার সাথে, জন আকাক্সক্ষার সাথে মিল রেখে উন্নয়ন করার জন্য প্রয়োজন ছিল এই যুগোপযোগী লক্ষ্যমাত্রার।
দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে এমডিজির লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে বাংলাদেশের সাফল্য সবার শীর্ষে। এমডিজির সময় শেষ হয়ে গেছে ২০১৫ সালে। আর ২০১৬ সাল থেকে শুরু হয়েছে নতুন লক্ষ্যমাত্রা। ২০৩০ সালকে গন্তব্য ধরে ১৫ বছর মেয়াদি এই পরিকল্পনার নাম দেওয়া হয়েছে ‘সাসটেইনেবল ডেভেলপমেন্ট গোল’ (এসডিজি) বা টেকসই উন্নয়ন পরিকল্পনা।

এমডিজির আটটির পর এবার টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্য বা এসডিজিতে ১৭টি লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। সেগুলো হলো: ১. সকল প্রকার দারিদ্র্য দূর করা; ২.খাদ্য নিরাপত্তা, পুষ্টির উন্নয়ন ও কৃষির টেকসই উন্নয়ন; ৩. সকলের জন্য সুস্বাস্থ্য নিশ্চিত করা; ৪. সবার জন্য ন্যায্যতাভিত্তিক ও মানসম্পন্ন শিক্ষার সুযোগ নিশ্চিতকরণ; ৫. জেন্ডার সমতা অর্জন এবং সকল নারীর ক্ষমতায়ন; ৬. সকলের জন্য নিরাপদ পানি ও স্যানিটেশনের ব্যবস্থাপনা; ৭. সকলের জন্য জ্বালানি বা বিদ্যুতের ব্যবস্থা নিশ্চিত করা; ৮. স্থিতিশীল ও অংশগ্রহণমূলক অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি, পূর্ণকালীন উৎপাদনমূলক কর্মসংস্থান ও কাজের পরিবেশ; ৯. স্থিতিশীল শিল্পায়ন এবং উদ্ভাবনকে উৎসাহিত করা; ১০. রাষ্ট্রগুলোর অভ্যন্তরীণ ও আন্তঃরাষ্ট্র বৈষম্য বিলোপ; ১১. মানব বসতি ও শহরগুলোকে নিরাপদ ও স্থিতিশীল রাখা; ১২. উৎপাদন ও ভোগ কাঠামোর স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করা; ১৩. জলবায়ু পরিবর্তন ও এর প্রভাব মোকাবেলায় তাৎক্ষণিক পদক্ষেপ গ্রহণ; ১৪. টেকসই উন্নয়নের জন্য সাগর, মহাসাগর ও সামুদ্রিক সম্পদ সংরক্ষণ ও পরিমিত ব্যবহার নিশ্চিত করা; ১৫. স্থলভূমির জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ ও উন্নয়ন; মরুকরণ প্রতিরোধ করা এবং জমির ক্ষয়রোধ ও জীববৈচিত্র্যের ক্ষতি কমানো; ১৬. শান্তিপূর্ণ ও অংশগ্রহণমূলক সমাজ, সকলের জন্য ন্যায়বিচার, সকল স্তরে কার্যকর, জবাবদিহি ও অংশগ্রহণমূলক প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলা; এবং ১৭. টেকসই উন্নয়নের জন্য এ সব বাস্তবায়নের উপায় নির্ধারণ ও বৈশ্বিক অংশীদারিত্বের স্থিতিশীলতা আনা।

এসডিজি লক্ষ্য পূরণ বাংলাদেশের জন্য সম্ভাবনার দ্বার যেমন উন্মোচিত করেছে, তেমনি চ্যালেঞ্জও হাজির করেছে। কারণ ১৭টি পরিকল্পনা সঠিকভাবে বাস্তবায়নের জন্য যেমন লিঙ্গ বৈষম্য কমিয়ে আনতে হবে, তেমনি টেকসই উন্নয়নের জন্য অঞ্চল ভিত্তিক পরিকল্পনা গ্রহণ করতে হবে। কারণ ওই ১৭ সূচকের সবগুলো সকল এলাকার জন্য সমানভাবে প্রযোজ্য নয়। আর পার্বত্য প্রেক্ষাাপট বিবেচনায় নিয়ে এটা সহজেই বলা যায় যে, এসডিজির ক্রমিক এক থেকে আট পর্যন্ত কর্মসূচিগুলোর ক্ষেত্রে পার্বত্য চট্টগ্রাম হওয়া উচিৎ প্রধান লক্ষ্যস্থান। ১১ নং ক্রমিকে আসা ‘মানব বসতি ও শহরগুলোকে নিরাপদ ও স্থিতিশীল রাখা’ বিষয়টিতো এবার দেশবাসীর সামনে প্রকট হয়ে ধরা পড়েছে। ১৩ জুন, ২০১৭ পাহাড় ধসে শুধুমাত্র রাঙামাটি জেলাতেই মারা গেছে ১২০ জন মানুষ।

সরাসরি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে অন্তত ১৫ হাজার পরিবার। অর্থের বিচারে এর ক্ষয়ক্ষতির হিসাব কষতে গেলে তা হবে বিরাট অংকের। মাথার উপর ছাদ হারানো মানুষ ছাড়াও তিনমাস যাবত মৌসুমী ফল থেকে শুরু করে সকল ধরনের ব্যবসা-বাণিজ্য বন্ধ থাকায় রাঙ্গামাটির অর্থনীতিতে যে ধস নেমেছে তা পুষিয়ে উঠতে অনেক সময়ের প্রয়োজন হবে। ১৩ নং ক্রমিকের বিষয়টিতো পার্বত্য এলাকা ঘিরেই আবর্তিত। তাই পার্বত্য এলাকা ঘিরে যদি বিশেষ পরিকল্পনা এবং কর্মসূচি গ্রহণ করা না হয় তবে, এমডিজির মতো এসডিজির সামগ্রিক হিসাবে দেশ এগিয়ে থাকবে বটে; কিন্তু পিছনে পড়ে থাকবে দেশের এক দশমাংশ পার্বত্য চট্টগ্রাম।

ভৌগোলিক কারণেই পার্বত্যাঞ্চল অন্য সকল জেলা থেকে ভিন্ন। যোগাযোগ দুর্গমতার অজুহাতে দীর্ঘ সময় এই অঞ্চল উন্নয়ন পরিকল্পনায় বেশ অবহেলিত ছিল। এখানে রয়েছে নানা সংস্কৃতির সমারোহ। শুনতে খারাপ লাগলেও অস্বীকার করার উপায় নেই যে, এখানে জাতিগত বিভেদ কমবেশি রয়েই গেছে।

সামাজিক শান্তি বিনষ্ট করার মতো নানা আঙ্গিকের রাজনীতি এবং স্বার্থের দ্বন্দ্ব এ এলাকার সার্বক্ষণিক অনুষঙ্গ। তা ছাড়া অনুন্নত যোগাযোগ ব্যবস্থাতো রয়েছেই, তদুপরি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের অভাব, কুসংস্কার ও গোঁড়ামী, সামাজিক অসচেতনতা, দুর্গমতার কারণে স্বাস্থ্য সেবার অপ্রতুলতা সবকিছুই এখানে বেশ প্রকট। তাই ২০৩০ সালের মধ্যে টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা অর্জন করতে হলে পার্বত্যাঞ্চলকে নিয়ে বিশেষ পরিকল্পনা গ্রহণের কোনো বিকল্প নেই। লিঙ্গ বৈষম্য তো কমিয়ে আনতে হবেই, সেই সাথে অঞ্চলগত বৈষম্যের বিষয়টিও পার্বত্যাঞ্চলের ক্ষেত্রে মাথায় রাখতে হবে।

তবে অস্বীকার করার উপায় নেই যে, উল্লেখিত ১৭টি লক্ষ্যমাত্রা অর্জনের জন্য অবশ্যই পার্বত্যাঞ্চলে স্থিতিশীল রাজনৈতিক পরিবেশ এবং শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান নিশ্চিত করতে হবে। শান্তিপূর্ণ পরিবেশ না থাকলে উন্নয়ন পরিকল্পনা বাধাগ্রস্ত হবে প্রতিনিয়ত। তাই শান্তির পথে যে সকল বাধা রয়েছে, তার গভীরে প্রবেশ করে একটি গ্রহণযোগ্য সমাধানের পথ বের করে আনতে হবে। তবে এই অজুহাতে বসে না থেকে সামাজিক ও রাজনৈতিক উন্নয়ন এবং অর্থনৈতিক মুক্তির লক্ষ্যে একই সাথে কাজ চালিয়ে যেতে হবে।

আনোয়ার আল হক: সম্পাদক, দৈনিক রাঙ্গামাটি ও সাধারণ সম্পাদক, রাঙ্গামাটি প্রেসক্লাব।

দিশারীর সকল লেখা একত্রে পড়তে ক্লিক করুন এখানে

No comments:

Post a Comment