Friday, October 6, 2017

আমার সাংবাদিকতা

এ কে এম মকছুদ আহমেদ
আমার সাংবাদিকতার প্রথম দিক সম্পর্কে লিখতে বসে কোনটা নিয়ে লিখবো তা বুঝে উঠতে পারছি না। কেননা, আমার সাংবাদিকতার প্রথম থেকে কয়েকটি দিক রয়েছে। তারপরও লিখছি। রাঙ্গামাটির লংগদু উপজেলার গুলশাখালীর অধিবাসী বিশিষ্ট কলামিস্ট এবং সাংবাদিক সৈয়দ ইবনে রহমত তার এলাকা থেকে প্রকাশিত একটা সাময়িকীর জন্য লেখা দিতে অনুরোধ করায় এই প্রয়াস।
আমার সাংবাকিতা শুরু হয়েছিল ১৯৬৯ সালে, দৈনিক আজাদীতে শুরু করেছিলাম। পরবর্তীতে ১৯৭৩ সালে ঢাকার জাতীয় দৈনিকে কাজ শুরু করি। এরপর নিজের সম্পাদনায় রাঙ্গামাটি থেকেই একটি সাপ্তাহিক পত্রিকা প্রকাশের উদ্যোগ গ্রহণ করি। ১৯৭৬ থেকে শুরু করে দুই বছরের অক্লান্ত চেষ্টার পর ১৯৭৮ সালে সাপ্তাহিক ‘বনভূমি’ প্রকাশ করি। এরই ধারাবাহিকতায় ১৯৮১-৮৩ থেকে দৈনিক গিরিদর্পণ পত্রিকার প্রকাশনা শুরু করি।

১৯৬৯ সালের নভেম্বরের পূর্বে আমি সাংবাদিকতা করবো বা সাংবাদিক হবো এটা কোদিন চিন্তাও করিনি, আমার চৌদ্দগোষ্ঠির মধ্যে তখন কোনো সাংবাদিক ছিল না। সাংবাদিকতা আমাকে চাপিয়ে দেয়া হয়েছিল, যা এখন আমার জন্য সোনায়-সোহাগা। কথায় আছে কেউ কিছু দিলে নিতে হয়। আমার ক্ষেত্রেও তাই হয়েছিল।

১৯৬৬ সালে আমার এক দূর সম্পর্কীয় ভাগিনার সাথে (তার নাম আজম খান, সে টিটিসি’র ছাত্র ছিল) রাঙ্গামাটিতে বেড়াতে এসেছিলাম। ইচ্ছা ছিল দুই দিনের মধ্যে চলে যাব, কিন্তু পারলাম না। থেকে গেলাম এই পাহাড়ী শহর রাঙ্গামাটিতে। তখন জোর করেই আমাকে প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষকের চাকরি দেওয়া হয়েছিল। প্রথমে কাউখালী উপজেলার বেতছড়ি প্রাথমিক বিদ্যালয়, পরে লংগদু উপজেলার সোনাই প্রাথমিক বিদ্যালয় এবং সর্বশেষ বরকলের গোরস্থান প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষকের দায়িত্ব পালন করেছি।

১৯৬৭ সালের জানুয়ারি মাসে কাউখালী থাকাকালীন সেখানকার স্কুলে ছাত্রছাত্রীদের বই সরবরাহ শুরু করি। মার্চ মাসে যখন বইয়ের সিজন শেষ তখন দেখলাম অনেক বই অবিক্রিত রয়েগেছে। এ ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে আমাকে বই ব্যবসায় উদ্বুদ্ধ করেছিলেন তখনকার জেলা শিক্ষা অফিসার জনাব আলী আহমেদ। তিনি পরামর্শ দিলেন, রাঙ্গামাটিতে একটি দোকান নিয়ে বইগুলো সেখানে সপ্তাহে বন্দের দিনে বিক্রি করার জন্য। তার পরামর্শক্রমে রিজার্ভবাজার চৌমুহনীতে হাজী বদরুজ মেহেরের দোকান ভাড়া নিয়ে কাজ শুরু করলাম। তারপর আস্তে আস্তে সেটা ‘রাঙ্গামাটি প্রকাশনী’ নামে বিরাট প্রতিষ্ঠান হলো। ওই সময়ে পত্রপত্রিকা, ম্যাগাজিন এবং অন্যান্য বই বিক্রি শুরু করেছিলাম।

১৯৬৯ সালের এক সকালে মিরসরাইয়ের গ্রামের বাড়ি থেকে ট্রেনে করে চট্টগ্রাম রেল স্টেশনে নামলাম। স্টেশনরোড দিয়ে হেঁটে আসার সময় একটি ঘটনার কারণে আমার সাংবাদিকতার সূত্রপাত। চট্টগ্রাম স্টেশন রোডের উপরে একদল লোক জটলা করছিল। আমিও কৌতূহলবশত উঁকি দিয়ে দেখি একটি লোক মাটিতে পড়ে আছে। লোকজন বলাবলি করছিল, লোকটি রাঙ্গামাটির লালুকালু শহর থেকে এসেছে। রাঙ্গামাটির কথা শুনে স্বাভাবিকভাবে আরও উৎসাহী হলাম।

লোকটি খুব আস্তে আস্তে কথা বলছিল, তার বাড়ি বরিশাল। সে কেপিএম’র কাগজ কলের কাঁচামাল বাঁশ সংগ্রহের জন্য বাঘাইহাটের ‘লালুকালু’ নামক স্থানে কাজ করতে গিয়েছিল। ঠিকাদারের অধীনে সেখানে নিয়োজিত হয়ে কাজ করতে গিয়েই মৃত্যুমুখে পতিত হয়েছে অনেকেই। তার অবস্থাও করুণ। তাৎক্ষণিকভাবে লোকজন চাঁদা উঠিয়ে তাকে হাসপাতালে পাঠানোর পর আমি রাস্তা দিয়ে আসছিলাম। তখন একজন লোক আমাকে ডেকে বলল,

অনে, কোন পত্রিকার সাংবাদিক?
আমি বললাম, আমি সাংবাদিক না।
তিনি বললেন, আপনিতো নোট বইতে লিখেছেন।
আমি বললাম, আমি রাঙ্গামাটি থাকি, রাঙ্গামাটির কথা শুনে নোট করছিলাম।

উনি আমাকে একরকম জোর করে আজাদীর অফিসে নিয়ে গেলেন। উনি ছিলেন, দৈনিক আজাদীর তৎকালীন চিফ রিপোর্টার জনাব ওবায়দুল হক। সে অনেক কাহিনী, শেষ পর্যন্ত দৈনিক আজাদীর রাঙ্গামাটি প্রতিনিধি হিসেবে কাজ শুরু। লেখার প্যাড, খাম ও কলম দিয়ে শুরু। সেই দিন থেকে সাংবাদিকতার মতো মহান এবং পৃথিবীর অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ জীবনযাপন শুরু করলাম।

সাংবাদিক হলাম, ডাকযোগে নিউজ পাঠানো শুরু করলাম। যে বিষয়টি নিয়ে চট্টগ্রামে কৌতূহল দেখিয়েছিলাম সেটা দিয়েই শুরু করলাম। তার পরদিন বিকাল বেলায় রাঙ্গামাটি লঞ্চঘাটে দেখলাম মারিশ্যা থেকে আসা লঞ্চ হতে একজন লোক সঙ্গে দুইজন আহত ব্যক্তিকে নিয়ে এসে পৌঁছার পর চারদিকে হুলুস্থুল পড়ে গেল। লোকগুলোর চেহারা সাদা হয়ে গেছে; জানা গেল, ম্যালেরিয়ায় আক্রান্ত হয়ে লোক মারা যাচ্ছে। নদীতে অনেক লাশ ফেলে দেয়া হয়েছে। কেপিএম-এর নির্ধারিত ঠিকাদারেরা দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে বাঁশ আহরণে এসব লোক সংগ্রহ করতো। তাদের লবণ খেতে দিত না, এমনকি যেখানে এদের থাকতে দিত সেখানে রোদের নাগালও পেত না; যার কারণে সাদা ফ্যাকাসে হয়ে যেতো শরীর। সে অনেক কথা। শুরু করলাম। এক সপ্তাহ পরে পোস্ট অফিসের পিয়ন এসে কয়েক কপি আজাদী দিয়ে গেল। প্রথমটিতে দেখি চট্টগ্রামের সে খবরটি খুব ভালোভাবে ছাপা হয়েছে। সাংবাদিকতার প্রথম খবর ছাপা হওয়াতে অনেক আনন্দ লাগছিল মনে। পরের সংবাদগুলোও গুরুত্ত্বসহকারে ছাপা হয়েছিল। পরে এ বিষয়ে কত রিপোর্ট যে ছাপা হয়েছে তার হিসাব নেই। পরবর্তীতে ঢাকার জনপদ, পূর্বদেশ পত্রিকায়ও অত্যন্ত গুরুত্ত্বসহকারে এসব খবর প্রকাশিত হওয়ায় এটার একটা স্থায়ী সমাধান হয়। এ সংক্রান্ত একটি খবর ভারতের পশ্চিমঙ্গের অনীক পত্রিকায় ‘বাংলাদেশের পার্বত্য চট্টগ্রামে দাশ শিবির’ শিরোনাম দিয়ে ছাপা হয়েছিল, যা অত্যন্ত আলোড়ন সৃষ্টি করেছিল।

বিভিন্ন রকম খবর সংগ্রহ করতে তখন অনেক কষ্ট হতো। লঞ্চ আর পায়ে হাঁটা পথ ছাড়া অন্যকোন উপায় ছিল না। খবর সংগ্রহ করতে গিয়ে কত রকম সমস্যায় যে পড়তাম তা লিখে শেষ করা যাবে না। প্রথমত, ভাষাগত সমস্যা; চাকমা এলাকায় মোটামুটি কোনো অসুবিধা হতো না। কিন্তু মারমা, ত্রিপুরা এলাকায় অসুবিধা হতো বেশি;  তাদের কথা মোটেও বুঝতাম না। তার উপর আবার বিশ্বাস-অবিশ্বাসের বিষয়তো ছিলই। তখনতো আর নিয়োগ পত্র বা পরিচয় পত্র ছিল না। অনেক জায়গা থেকেই খালি হাতে ফিরতে হতো। কিন্তু দমে যাইনি। পরবর্তীতে যখন সাপ্তাহিক বনভূমি প্রকাশনা শুরু করলাম তখনকার পরিস্থিতি ভিন্নরূপ। পত্রিকা প্রকাশনার শুরুর ইতিহাস ও প্রেক্ষাপটও ভিন্ন। ১৯৭৬ সালে যথারীতি পত্রিকার ডিক্লারেশন নিয়ে শুরু করার প্রাক্কালে জেলাপ্রশাসক (জনাব আলী হায়দার খান) ডেকে বললেন, পত্রিকার প্রকাশনা শুরু করা যাবে না। যেহেতু সেনা গোয়েন্দা সংস্থার ছাড়পত্র নেই, বিফল মনোরথ হয়ে ফিরে এলাম। তবে দমলাম না, হার মানলাম না। তারপরও চলতে লাগলো চেষ্টা-তদবির।

ওই ১৯৭৬ সালেই খাগড়াছড়ির দীঘিনালা দশবল বৌদ্ধ রাজবিহারে শ্রীলঙ্কা থেকে আনীত বোধিবৃক্ষের চারা রোপণ অনুষ্ঠানে শ্রদ্ধেয় ভিক্ষুবৃন্দের আমন্ত্রণে সে অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণ করি। তখন এ বিহারে শ্রীমৎ বিমলাতষ্য ভিক্ষু, শ্রীমৎ শ্রদ্ধালংকার ভিক্ষুসহ অন্য একজনের (এই মুহুর্তে নাম মনে আসছে না) সহযোগিতায় পরবর্তীতে দশবল বৌদ্ধ রাজবিহারের বোধিবৃক্ষের চারা রোপণ উপলক্ষে সাপ্তাহিক বনভূমির প্রথম বিশেষ সংকলন প্রকাশ করি। সেই থেকে শুরু। অনেক ত্যাগের বিনিময়ে ১৯৭৮ সালের ২৬ মার্চ থেকে পার্বত্য চট্টগ্রাম অঞ্চল অর্থাৎ তিন জেলার সর্বপ্রথম এবং একমাত্র সংবাদপত্র সাপ্তাহিক বনভূমির প্রথম আনুষ্ঠানিক প্রকাশনা শুরু হয়। তখন সরকার এবং প্রশাসনের সাথে এখানকার জনগণের তেমন কোনো যোগাযোগ ছিল না। সাপ্তাহিক বনভূমি ছিল সেতুবন্ধনের একমাত্র মাধ্যম। যেখানে পার্বত্য চট্টগ্রামের বিভিন্ন বিষয় নিয়ে লেখালেখির ফলে অনেক সমস্যার সমাধানের পথ সুগম হয়েছিল।


এ কে এম মকছুদ আহমেদ : পার্বত্য চট্টগ্রামের সাংবাদিকতা জগতের পথিকৃৎ এবং রাঙ্গামাটি থেকে প্রকাশিত দৈনিক গিরিদর্পণ পত্রিকার সম্পাদক।


No comments:

Post a Comment