Wednesday, October 11, 2017

সেইলর’স আইল্যান্ড

মুহাম্মদ রিয়াজুল হাসান
রাত আটটা। গভীর সাগরে একটা মার্চেন্ট জাহাজ চলছে নতুন বন্দরের দিকে। জাহাজের চিফ ইঞ্জিনিয়ার মাসুদ নিজের কেবিনে বসে সুন্দর করে সুইসাইড নোট লিখছেন।
ইংরেজিতে লিখেছেন, ‘পারিবারিক বিভিন্ন সমস্যায় জর্জরিত হয়ে জীবনটা একঘেঁয়ে লাগছে। তাই প্রিয় সাগরের বুকে নিজেকে সমর্পণ করলাম। জাহাজে আসবার আগে আমি আমার সকল স্থাবর-অস্থাবর সম্পত্তি বিদেশি একটা এনজিওতে দান করে এসেছি। আর আমার সাবেক স্ত্রীর উপর কোনো অভিযোগ বা অনুযোগও নেই। সে তার নতুন জীবন নিয়ে
সুখে থাকুক। আমি আমার মৃত বাবা-মা এবং মৃত সন্তানের কাছে চললাম। আমার মৃত্যুর জন্য কেউ দায়ী নয়, আমি ছাড়া।’
সাক্ষর- মাসুদ ই এলাহী।

তারপর চিঠিটা বেডের পাশের টেবিলে রেখে দিয়ে কেবিনের লাইট অফ করে ঘুমিয়ে পড়লেন।

রাত দুইটা। জাহাজের ডিউটি অফিসার, ইঞ্জিনিয়ার আর ওয়াচকিপার ছাড়া কেউ জেগে নেই। গভীর সাগরে লোহার দানবটা ইঞ্জিনের মৃদু গুঞ্জন তুলে একই গতিতে ছুটে চলেছে। চিফ ইঞ্জিনিয়ার মাসুদের কেবিনে একটা ফোন এলো। ঘুম ভেঙ্গে মাসুদ ফোন ধরলেন। ক্যাপ্টেন সাহেবের ফোন, শুধু বললেন, ‘মাসুদ জাহাজ যায়গামতো পৌঁছেছে। সময় হয়েছে। বেস্ট অফ লাক মেট!’

মাসুদ ফোনটা রেখে বিছানা ছেড়ে উঠে দাঁড়ালো। তারপর আস্তে করে কেবিনের দরজা খুলে বেরিয়ে গেলো। সিঁড়ি বেয়ে নেমে গেল জাহাজের পেছনে। সেখানে কিছু জিনিসের সাথে একটা ব্যাগ আগে থেকে রেডি করা আছে। ব্যাগটা দু’প্যাকেট সিগারেট, লাইটার, বড় মাথার হ্যাট, ছটা হ্যান্ড ফ্লেয়ার, খাবার পানি, শুকনো খাবারে ভরপুর। আর একটা ডগট্যাগ লকেট আছে। লকেটটায় লেখা, ‘চিফ ইঞ্জিনিয়ার মাসুদ, সেইলর’স আইল্যান্ড, সেইলর নং-১৩৫৫’।

প্রথমে একটা লাইফ জ্যাকেট পরে নিল, তার উপর ওয়াটারপ্রুফ ব্যাগটা কাঁধে নিয়ে ব্যাগের স্ট্রাইপ ভালো করে বেঁধে নিল। তারপর আগে থেকে রাখা লাইফ বয় দুইটার ভেতর নিজেকে গলিয়ে দিল। লাইফ বয়কে এক্সট্রা রোপ দিয়ে নিজের কোমরে বেঁধে নিল। তারপর জাহাজের একদম কিনারে চলে এলো।

সাগরে ঝাঁপ দিতে যাচ্ছে মাসুদ। চেনাজানা দুনিয়া থেকে বিদায় নিচ্ছে। কোনো আবেগ বা অনুভূতি কাজ করছে না। সে ডেস্পারেট। এই মনুষ্য দুনিয়ায় এমন কোনো কিছু নেই যার জন্য মাসুদ মায়া বোধ করবে। তথাকথিত সফল এই মানুষটার জীবনে কাছের মানুষের প্রিয় মানুষের নিমকহারামীতে বিষিয়ে গেছে। এখানে বেঁচে থাকার আর কোনো মানে নেই।

নিজের শেষ কর্মস্থলের দিকে শেষবার তাকিয়ে সাগরে লাফিয়ে পড়লো মাসুদ!

আকাশে চাঁদ আছে। দুইটা লাইফ বয়ের উপর নিজের শরীরটা এলিয়ে দিয়ে চিৎ হয়ে শুয়ে আছে মাসুদ। দূরে একটু একটু করে মিলিয়ে যাচ্ছে মাসুদের জাহাজ। জাহাজের আলোটা দূরে মিলিয়ে যেতেই একরাশ নিঃসঙ্গতা ঘিরে ধরলো মাসুদকে। ব্যাগের ভেতর থেকে সিগারেট বের করে ধরালো। সাগর খুব ঠা-া। মনে হচ্ছে, সুন্দর করে বিছানো পানির চাদরের উপর শুয়ে আছে মাসুদ। আকাশ ভর্তি তারা। সে তারার দিকে তাকিয়ে নিজেকে মৃত ভাবতে বেশ লাগছে। মৃত্যুর পরের জগৎটা যদি ঠিক এরকম হতো!

যে যায়গায় মাসুদ ঝাঁপ দিয়েছে সেখান থেকে নিকটস্থ সাগর পাড় প্রায় ৩৫০ নটিক্যাল মাইল দূরে। মাসুদ সাগরের যে পজিশনে লাফিয়ে পড়েছে সেখানে ঘণ্টা দুয়েক বাদে একটা রেস্কিউ হেলিকপ্টার আসার কথা। হেলিকপ্টারটা সেইলর’স আইল্যান্ড নামক একটা এনজিওর। পৃথিবীজুড়ে সমুদ্রের নাবিকদের নিয়ে কাজ করে ওরা। তাদের সবচে ইন্টারেস্টিং এবং টপ সিক্রেট প্রজেক্ট হচ্ছে সেইলর’স আইল্যান্ড। শুধুমাত্র বাছাই করা কিছু ক্যাপ্টেন ও চিফ ইঞ্জিনিয়ার সেটার কথা জানে। তাদেরই মাত্র সদস্য পদ দেওয়া হয়। যাদের জীবন দুর্বিষহ হয়ে গেছে তারা চাইলে সে দ্বীপে চলে যেতে পারে। তবে শর্ত একটাই, সে দ্বীপে গেলে আর ফেরৎ আসা যায় না। এ জগতের সাথে যোগাযোগ করা যায় না। সেখানে মৃত্যু অবধি থেকে যেতে হয়।

সাত সাগরের কোনো এক যায়গায় একটা আইল্যান্ড আছে। সে আইল্যান্ডে কোনো দেশের দখলদারিত্ব নেই। ফ্রি আইল্যান্ড। এমনকি পৃথিবীর মানচিত্রে বা গুগল ম্যাপেও সেটার অস্তিত্ব নেই। রানি এলিজাবেথ এক ক্যাপ্টেনকে খুশি হয়ে সে আইল্যান্ড গিফট করেছিলেন। সে ক্যাপ্টেনকে দেওয়া কথা মতো আইল্যান্ডটি মানচিত্র থেকে সরিয়ে ফেলা হয়। সে গল্প অন্যদিন করা যাবে।

ঘণ্টা দুয়েক পর আকাশে একটা হেলিকপ্টারের নিশানা দেখতে পেল মাসুদ। সে তাড়াতাড়ি ব্যাগ থেকে হ্যান্ড ফ্লেয়ার বের করে জ্বালিয়ে দিলো। কমলা আলোয় চারপাশ উজ্জ্বল হয়ে গেলো। হেলিকপটারের পাইলট আলো দেখতে পেয়েছে। সে চললো মাসুদকে উদ্ধার করতে।

পরদিন সকালে জাহাজের ক্যাপ্টেন অফিসে মেসেজ দিলেন, অতি দুঃখের সাথে জানাচ্ছি, গতকাল রাতের কোনো এক সময় চিফ ইঞ্জিনিয়ার মাসুদ সাগরে ঝাঁপিয়ে আত্মহত্যা করেছেন।

তারপর সুইসাইড নোটটা স্ক্যান করে মেইল করে দিলেন অফিসে। ক্যাপ্টেনও সেইলর’স আইল্যান্ডের সম্মানিত সদস্য।

মুহাম্মদ রিয়াজুল হাসান : একটি আন্তর্জাতিক শিপিং কোম্পানিতে থার্ড অফিসার পদে দায়িত্ব পালন করছেন।

দিশারীর সকল লেখা একত্রে পড়তে চাইলে এখানে ক্লিক করুন

No comments:

Post a Comment