Monday, October 23, 2017

লাভজনক গরুর খামার

জালাল উদ্দিন ওমর
এক গাভী থেকে যেভাবে ৪৮৭ : ১৯৮৬ সাল। হঠাৎ খামার করার ইচ্ছে জাগে ১৪ বছরের এক কিশোরের। যেই ভাবা সেই কাজ। একটি মাত্র গরু এবং কিছু মুরগি নিয়ে শুরু হলো খামার। সেই কিশোরের খামারে এখন গরু রয়েছে ৪৮৭টি! আর মুরগি রয়েছে ২ লাখ ৩০ হাজার। প্রতিদিন গড়ে ২ হাজার ৭শ’ লিটার দুধ বাজারজাত করেন তিনি। তার প্রতিষ্ঠানে ইন্টার্নি করেন চট্টগ্রাম ভেটেরিনারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরাও! তিন দশকের সাধনায় হাজার টাকার মূলধনকে শত কোটি টাকার সম্পদে রূপান্তর করেছেন যিনি, তার নাম রকিবুর রহমান টুটুল। তিনি বর্তমানে নাহার এগ্রো গ্রুপের স্বত্বাধিকারী।
 সফল মাহফুজা মিনা: পাবনার বেড়া উপজেলার বনগ্রামের আব্দুল মজিদ মাস্টারের মেয়ে মাহফুজা মিনা ২০০০ সালে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে রাষ্ট্রবিজ্ঞানে মাস্টার্স সম্পন্ন করে যোগ দেন শিক্ষকতায়। ২০১০ সালে মাত্র দুটি গরু নিয়ে মিনা শুরু করেন ডেইরি ফার্ম। ৫ বছরের ব্যবধানে তিনি ৫০টি গরু, ভেড়া, হাঁস, মুরগি নিয়ে জেলার অন্যতম বৃহৎ ডেইরি ফার্মের মালিক। তীব্র ইচ্ছা শক্তি, কঠোর পরিশ্রম আর একাগ্রতার কারণে মিনা আজ উত্তরবঙ্গের অন্যতম সফল ডেইরি ব্যবসায়ী।

বদলে গেলো বেবির জীবন: সিলেটের বেবি আক্তারের স্বামী দুধ কিনে বাড়ি বাড়ি গিয়ে বিক্রি করতেন। ২০০১ সালে বেবি সাত হাজার টাকা দিয়ে একটি বাছুর কিনে লালন-পালন শুরু করেন। ১৩ বছর পর দেখা যায় বেবির খামারে রয়েছে ২৭ লাখ টাকার গাভী। ৩৬টি গাভী থেকে প্রতিদিন আড়াইশ’ লিটার দুধ সংগ্রহ করেন। বেবি এখন অনেকের কাছে প্রেরণা।
 
গরু লালন-পালন করে টুটুল, মিনা এবং বেবির মতো সফল ও প্রতিষ্ঠিত হয়েছেন এ দেশে এমন অনেক মানুষ। দিন দিন এ সম্ভাবনা বাড়ছে। কেননা, মানুষের জীবনে গরুর উপকারিতা এবং চাহিদার শেষ নেই। মানুষের জন্য গরুর দুধ হচ্ছে আদর্শ খাদ্য। যা সকল বয়সের মানুষের জন্যই উপকারী। গরুর গোশত ছাড়া মেহমানদারী তো চলেই না। ঈদুল আজহায় কোরবানির জন্য গরুর চাহিদা দিন দিন শুধু বাড়ছেই। গরুর চামড়া দিয়ে তৈরি হয় জুতা, সেন্ডেল, ব্যাগসহ চামড়া জাতীয় বিভিন্ন দ্রব্য; যা সকল মানুষের জন্য নিত্যপ্রয়োজনীয় ব্যবহার সামগ্রী। গরুর গোবর একটি অত্যন্ত উন্নতমানের জৈব সার। শুকনো গোবর একটি ভালো মানের জ¦ালানি। তাছাড়া গোবর ব্যবহার করে বায়োগ্যাস উৎপাদন করে জ্বালানির কাজে লাগানো যায়, আবার বিদ্যুৎ উৎপাদনও করা যায়। গরুর হাড় পোল্ট্রি খাদ্য তৈরিতে ব্যবহৃত হয়। এমনকি গরুর নাড়িভুঁড়িও মজাদার স্যুপ তৈরিতে ব্যবহৃত হয়।
 
প্রাচীনকাল থেকেই আমাদের দেশে কৃষকরা গরু লালন-পালন করে আসছেন মূলত কৃষি কাজে ব্যবহারের জন্য। কলের লাঙ্গল আসায় এখন সে প্রয়োজন আর নেই। তাই বলে গরুর প্রয়োজনীয়তা কমেনি, বরং বাড়ছে প্রতিনিয়ত। ফলে দেশে যে পরিমাণ গরু উৎপাদিত হয় তাতে আমাদের চাহিদা মিটে না, ভারত থেকে প্রতি বছর  প্রায় ৩০ লাখ গরু আনতে হয়। তাতেও গোশতের দাম সাধারণ মানুষের নাগালে রাখা যাচ্ছে না। অপরদিকে অস্ট্রেলিয়া, নিউজিল্যান্ড, ডেনমার্কসহ আরও কয়েকটি দেশ থেকে গুঁড়ো দুধ আমদানি করে দুধের চাহিদা মিটাতে হচ্ছে। এভাবে গরু এবং গরুর দুধ আমদানিতে প্রতি বছর হাজার হাজার কোটি টাকা খরচ করতে হচ্ছে। অথচ, গ্রামে গ্রামে ব্যক্তিগত বা সমবায় ভিত্তিক উদ্যোগ নিয়ে গরুর খামার গড়তে পারলে টুটুল, মিনা এবং বেবির মতো আমরা যেমন নিজেরা প্রতিষ্ঠিত হতে পারি, তেমনি দেশকেও গোশত ও দুধ উৎপাদনে স্বয়ংসম্পূর্ণ করতে পারি।
 
ব্যক্তিউদ্যোগে বাড়িতে ৪/৫টি গরু পালন করা তেমন কোনো কঠিন কাজ না; সেটি হোক দুধ কিংবা গোশত উৎপাদনের জন্য। তবে পরিকল্পিত উপায়ে খামার গড়তে হলে উদ্যোগটি আরেকটু বড় হওয়াই ভালো। যদি কারো পক্ষে একা করা সম্ভব হয়, তাহলেই একাই করতে পারেন। আরও বড় উদ্যোগ নিতে হলে পাড়ার সকলে মিলে প্রথমে একটি সমিতি করতে পারেন। প্রথমে গরু রাখার জন্য সমিতির উদ্যোগে একটি বড় আকারের ঘর তৈরি করা হবে এবং প্রয়োজনমত জমি লিজ নিয়ে ঘাস চাষের ব্যবস্থা করতে হবে। তারপর সমিতির সামর্থ্য অনুযায়ী গরু কেনা হবে এবং পালন করা হবে। বর্গা সিস্টেমেও গরু সংগ্রহ করা যেতে পারে। এভাবে খামারের আকার বড় হলে পশু ডাক্তার রেখে নিয়মিত দেখভালের ব্যবস্থাও করা যাবে।
 
গ্রামে গ্রামে সমবায় সমিতি গড়ে তুলে গরুর খামার প্রতিষ্ঠা করলে কর্মসংস্থান বাড়বে, বেকারদের কাজে লাগানো যাবে। গ্রামের অর্থনীতি সমৃদ্ধ হবে, শহরের ওপর চাপ কমবে। এগিয়ে যাবে দেশ।

জালাল উদ্দিন ওমর: সিইও, শাহজালাল এগ্রো কমপ্লেক্স, বাঁশখালী, চট্টগ্রাম।


No comments:

Post a Comment