Wednesday, October 25, 2017

হাতের মুঠোয় কৃষি তথ্যসেবা

এম আব্দুল মোমিন
জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম শুধু একজন কবি নন; আমার মতে, তিনি একজন দার্শনিকও বটে। আজ থেকে শতবর্ষ আগে তিনি সংকল্প কবিতায় লিখেছিলেন, ‘পাতাল ফেড়ে নামব নীচে, ওঠব আবার আকাশ ফুঁড়ে; বিশ্ব-জগৎ দেখবো আমি আপন হাতের মুঠোয় পুরে’। জীবদ্দশায় কবি আপন হাতের মুঠোয় জগৎ না দেখতে পারলেও তার সেই অভিলাষ আজ শতভাগ সত্যি। তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তিতে বাংলাদেশের অগ্রগতি ও অর্জনে কবির সেই ভবিষ্যতবাণীর প্রতিফলন সর্বত্র। দেশের প্রধান খাত কৃষিও তাতে পিছিয়ে নেই। তথ্যপ্রযুক্তির পাখায় ভর করে সে অর্জনের সুফল যাতে দেশের কৃষি ও কৃষক সমভাবে পায় সে লক্ষ্যে নেওয়া হয়েছে নানা উদ্যোগ। কৃষকদের জন্য দরকারি নানা তথ্য ও পরামর্শ যেন সহজেই কৃষকের কাছে পৌঁছতে পারে সে জন্য কৃষিতে তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তির যেসব সুবিধা উন্মুক্ত হয়েছে তার মধ্যে ই-কৃষি, কৃষি ডাক্তার, কৃষি কল সেন্টার, বাংলাদেশ রাইস নলেজ ব্যাংকসহ কৃষিভিত্তিক বিভিন্ন মোবাইল অ্যাপ্লিকেশন ও ওয়েবসাইট চালু রয়েছে।
সাম্প্রতিক কিছু উদ্ভাবনী উদ্যোগ সে গতিশীলতাকে আরও ত্বরান্বিত করেছে। প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের একসেস টু ইনফরমেশনের (এটুআই) সার্বিক তত্ত্বাবধানে এবং কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতর (ডিএই) কর্তৃক বাস্তবায়িত তিন উদ্ভাবনী সেবা হলো- কৃষকের জানালা, কৃষকের ডিজিটাল ঠিকানা ও বালাইনাশক নির্দেশকা।

কৃষকের জানালা: কৃষকের জানালার মূল উদ্ভাবক ও পরিকল্পনাকারী সিলেটের বালাগঞ্জের উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা আবদুল মালেক। তিনি জানান, কৃষকদের ফসলের নানা সমস্যার দ্রুত ও কার্যকরভাবে সমাধান দেওয়ার একটি ডিজিটাল প্রয়াস কৃষকের জানালা। ফসলভিত্তিক নানা সমস্যার চিত্র যৌক্তিকভাবে সাজিয়ে তৈরি করা হয়েছে এটি। যেখানে ছবি দেখে কৃষক নিজেই তার সমস্যাটি চিহ্নিত করতে পারেন এবং চিহ্নিত ছবিতে ক্লিক করলেই সমস্যার সমাধান মনিটরে ভেসে ওঠে। এখানে মাঠ ফসল, শাক-সব্জি, ফল-মূল ও অন্যান্য গাছের রোগ-বালাই, পোকা-মাকড়, সারের ঘাটতি বা অন্যান্য কারণে যেসব সমস্যা হয়; সেসব সমস্যা ও তার সমাধান যুক্ত করা হয়েছে। প্রতিটি সমস্যার একাধিক ছবি এবং কমপক্ষে একটি প্রতিনিধিত্বপূর্ণ ছবি যুক্ত করা হয়েছে; যাতে কৃষক সহজেই তার সমস্যাটি চিহ্নিত করতে পারে। স্মার্টফোনের মাধ্যমে ‘কৃষকের জানালা’ www.infokosh.gov.bd ওয়েবসাইটটিতে প্রবেশ করে ফসল চাষে চিহ্নিত সমস্যায় ক্লিক করলেই মিলবে সমাধানের বার্তা।
 
বালাইনাশক নির্দেশিকা : বালাইনাশক বা পেস্টিসাইড ব্যবহারে নানান সমস্যায় পড়েন কৃষক। কোন জমিতে কখন কতটুকু বালাইনাশক কখন প্রয়োগ করবেন এ সম্পর্কিত বিস্তারিত তথ্যাদি কৃষকসহ সকলের দোরগোড়ায় পৌঁছে দিতে ডিজিটালাইজড ‘বালাইনাশক নির্দেশিকা’ নামক ওয়েবপেজ ও মোবাইল অ্যাপ্লিকেশন তৈরি করেছেন ময়মনসিংহের ফুলপুর উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা সুকল্প দাস। ‘বালাইনাশক নির্দেশিকা’ অ্যাপসে প্রবেশ করে ক্ষতিকর পোকার নাম লিখলেই এর বিপরীতে কার্যকর সকল বালাইনাশকের গ্রুপের নাম আসবে। আর গ্রুপে ক্লিক করলেই ওই বিভিন্ন কোম্পানির বাজারজাতকৃত সকল বালাইনাশকের বাণিজ্যিক নামের তালিকা আসবে। সেটি দেখে প্রয়োজন মতো বালাইনাশক কিনতে পারবেন কৃষকরা। সুকল্প দাস বলেন, এ ওয়েবপেজ ও বালাইনাশক নির্দেশিকার মাধ্যমে শুধু কৃষকরাই নন, কৃষি সেবাদানকারী বিভিন্ন কোম্পানি, গবেষক, কৃষিশিক্ষায় নিয়োজিত ছাত্র-শিক্ষক সবাই উপকৃত হবেন। তিনি আরও জানান, অ্যান্ড্রয়েড মোবাইলের গুগল প্লে স্টোরে Pesticide Prescriber লিখে সার্চ দিয়ে কিংবা ওয়েবলিংক pest2.bengalsols.com ব্রাউজ করে সবাই এ সুবিধা পাবেন।
 
কৃষকের ডিজিটাল ঠিকানা: এই অ্যাপসটির মূল উদ্ভাবক জাতীয় কৃষি প্রশিক্ষণ একাডেমির সিনিয়র সহকারী পরিচালক মুহাম্মদ শাহাদৎ হোসাইন সিদ্দিকী। তিনি জানালেন, অ্যাপসটি তৈরির পেছনের গল্প। তখন তিনি বেলকুচিতে উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা পদে কর্মরত। বেলকুচি সদর এবং বড়ধূল ইউনিয়ন আয়তনে বেশ বড়। নদী পার হয়ে উপজেলা সদরে আসতে অনেক কৃষকের আধাবেলা ফুরিয়ে যায়। কোনো এক রবিবারে তিনি দাপ্তরিক কাজে গিয়েছিলেন জেলা সদরে। বেলকুচি ফিরে অফিস সহকারীর কাছে জানতে পারেন, স্থানীয় বড়ধূলের কৃষক শাহ আলম এসেছিলেন পরামর্শের জন্য। অনেকক্ষণ বসেছিলেন। পরে চলে গেছেন। পরদিন তিনি নদী, মেঠোপথ আর চরের ঢাল পেরিয়ে শাহ আলমের বাড়ি যান। শাহ আলমের জমি ও ফসল দেখে ফেরার পথে এক বৃদ্ধের সঙ্গে দেখা হলো। তিনি জানালেন, এক সপ্তাহে তিন দিন কৃষি অফিসে গেলেও অফিসারের দেখা পাননি। যেতে অনেক কষ্ট হয়েছে আর খরচও হয়েছে অনেক। বাসায় ফিরে ভাবতে বসলেন কী করা যায়। এমন একটি সফটওয়্যার তৈরির কথা ভাবলেন, যার মাধ্যমে কৃষক ঘরে বসেই সেবা পায়। সে চিন্তার বাস্তব রূপ এই কৃষকের ডিজিটাল ঠিকানা। ফসল চাষাবাদে সব ধরনের সমস্যার সমাধান পাওয়া যায় ‘কৃষকের ডিজিটাল ঠিকানা’ http://digitalkrishi.dae.gov.bd/ নামক অ্যাপসে। এতে মিলবে ১২০টি ফসল উৎপাদনের যাবতীয় তথ্য। রোগ, পোকামাকড় দমন, যুগপোযোগী ও আধুনিক প্রযুক্তির উদ্ভাবনসহ নানা তথ্যে ভরপুর এই অ্যাপস। এই অ্যাপসের একটা অফলাইন ভার্সন করা হবে। যা মোবাইলে রাখতে পারবেন কৃষকরা। এতে ইন্টারনেট ছাড়াই কৃষকরা ব্যবহার করতে পারবেন। গুগল প্লে স্টোরে থাকবে সেখান থেকে অ্যাপসটি পাওয়া যাবে। এছাড়া কেউ ইচ্ছে করলে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের ওয়েবসাইট থেকেও অ্যাপসটি ডাউনলোড করতে পারবেন।

এম আব্দুল মোমিন : ঊর্ধ্বতন যোগাযোগ কর্মকর্তা, ব্রি, গাজীপুর।

No comments:

Post a Comment