তৌহিদুল রেজা:
জীবনে যেকোনো সফলতার জন্য চাই পর্যাপ্ত সুযোগ এবং তা কাজে লাগানোর যোগ্যতা। সুযোগ কাজে লাগানোর ক্ষেত্রেই মেধার পরিচয় দিতে হয়। তাই মেধা যাই থাকুক না কেন, আগে প্রয়োজন সুযোগ, কেবল সুযোগের অভাবেই অসংখ্য মেধাবীকে জীবনে বৈষয়িকভাবে ব্যর্থ হতে দেখি। লংগদুর মতো প্রান্তিক অঞ্চলে আমরা যারা বেড়ে উঠেছি তারা খুব ভালো করেই বুঝতে পারি সুযোগ এখানে কত অপ্রতুল; আর তা কাজে লাগানোই বা কত কঠিন।
আমার নিজের কথা যদি বলি তাহলে অবশ্যই বলব, অষ্টম শ্রেণিতে উত্তীর্ণ হওয়ার পর রাবেতা মডেল হাই স্কুলের ইংরেজির শিক্ষক মামুন স্যারের সান্নিধ্য পাওয়াই ছিল আমার জীবনের শ্রেষ্ঠ সুযোগ এবং সৌভাগ্যের বিষয়। আর মা-বাবার চেষ্টা তো সব সময়ই ছিল।
প্রথমবারের মতো অংশ নিয়ে ৩৬তম বিসিএস পরীক্ষায় ভাইভা দিয়ে এলাম, এখন চূড়ান্ত ফলপ্রার্থী। বিসিএস খুবই প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষা। ভালো এবং সম্মানজনক চাকরি হিসেবে আমার লক্ষ্য একজন বিসিএস ক্যাডার হওয়া। এ লক্ষ্য অর্জন হয়তো জীবনে বিশাল কোনো সফলতা নয়, কিন্তু নিজের অতীত চিন্তা করলে তা আমার জন্য সত্যিই বিশাল বলেই মনে হয়। জারুল বাগানের মতো শিক্ষাবিমুখ গ্রামে বড় হয়ে এতদূর কল্পনা করারও উপায় ছিল না আমার। মনে পড়ে, স্কুলে পড়ার সময় আমার স্বপ্নছিল কোনো রকমে এসএসসি পাশ করে প্রাইমারি স্কুলের শিক্ষক হওয়ার চেষ্টা করব। দশম শ্রেণিতে পড়ার সময় এক সিনিয়র আপুর এসএসসি পরীক্ষায় ‘এ মাইনাস’ পেয়ে উচ্ছ্বাস দেখে কি আফসুসইনা করেছিলাম, আমিও যদি পেতাম! আসলে তখন তো কোনো কিছুর স্বপ্ন দেখা সত্যিই কঠিন ছিল। পরবর্তীতে এসএসসিতে যা পেলাম তা আমার লক্ষ্যেরও বাইরে ছিল। এরপর এইচএসসিতে ‘এ প্লাস’ পাওয়া, চট্টগ্রাম বিশ^বিদ্যালয়ে ভর্তি পরীক্ষা দিয়ে সবক’টি ইউনিটে মেরিটে টিকে ইংরেজি বিভাগে ভর্তি হওয়া এবং অনার্স ও মাস্টার্স কমপ্লিট করা এবং সর্বশেষ বিসিএস ভাইভা দিয়ে আসা- সবই অনায়াসে হয়েছে।
এসব কিছুর জন্য প্রয়োজন ছিল অনুপ্রেরণা, যা আমি মামুন স্যারের কাছ থেকে পেয়েছিলাম। নবম-দশম শ্রেণিতে পাওয়া সুযোগটিই আমার ভবিষ্যৎ পরিবর্তন করে দিয়েছে। তাই এখন আমার লক্ষ্যে পৌঁছার স্বপ্ন দেখতে খুব একটা কষ্ট হয় না। ভবিষ্যতে কী হবে জানি না, তবে ভালো-মন্দ যাই হোকনা কেন, নিজে ব্যক্তিগতভাবে মোটামুটি উল্লেখযোগ্য কোনো অবস্থানে পৌঁছাতে পারি বা না পারি তাতে আমার অর্জিত শিক্ষার কমতি হবে না। এ রকম প্রত্যন্ত অঞ্চল থেকে উঠে আসাটাই যে কারো জন্য বিশাল সন্তুষ্টির ব্যাপার, যেখানে অনেক ত্যাগ ও কষ্ট স্বীকারের ফলে সামান্য অর্জনও অনেকের জন্য তৃপ্তিদায়ক হয়ে উঠে। আর প্রয়োজনীয় পরিশ্রমটুকু করতে পারলে আমাদের এ অঞ্চলের অনেক ছাত্রছাত্রীর ভবিষ্যতের গল্প অন্যরকম করে লেখার মতো মেধা ও যোগ্যতা আছে এ ব্যাপারে কোনো সন্দেহ নেই। কেননা, সফলতার জন্য পরিশ্রমের বিকল্প নেই।
তৌহিদুল রেজা: বিএ (অনার্স), এমএ, ইংরেজি বিভাগ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়।
No comments:
Post a Comment