Thursday, August 9, 2018

আইনের খুঁটিনাটি


কামাল হোসেন সুজন::
মানুষ সমাজবদ্ধ জীব। আর সমাজ বা রাষ্ট্র চলে কিছু আইনী কাঠামো মেনে। নাগরিক হিসেবে আমাদের উচিৎ সমাজ বা রাষ্ট্রের সে আইন সম্পর্কে সঠিক ধারণা রাখা। কিন্তু বাস্তবতা হচ্ছে আমরা রাষ্ট্রের প্রচলিত আইনসমূহ সম্পর্কে খুব কমই জানি। তাই আইনের বিধি-বিধান না জেনে কিংবা কম জেনে অথবা আন্দাজের ওপর নির্ভর করে কাজ করতে গিয়ে কখনও কখনও অহেতুক আইনী ঝামেলায় জড়িয়ে ক্ষতির শিকার হই। দুঃখের বিষয় হচ্ছে, রাষ্ট্রযন্ত্র জনগণকে শতভাগ শিক্ষাদানের প্রতিশ্রুতি দেয় কিন্তু প্রাথমিক হতে উচ্চতর শ্রেণি পর্যন্ত কোথাও আইনের কোনো অধ্যায় নেই। তাই একজন সচেতন নাগরিক হিসেবে আমাদের নিজ দায়িত্বেই প্রচলিত আইনের কিছু বই কিনে পড়া উচিৎ।
এতে নিজের প্রয়োজনে আইন সম্পর্কে সচেতনতাকে যেমন কাজে লাগানো যাবে, তেমনি যারা এ সম্পর্কে জানেন না কিংবা পড়ালেখাই জানেন তাদের সৎ পরামর্শ দিয়ে উপকার করা যাবে। বাংলাদেশের নাগরিক হিসেবে যেসব আইন সম্পর্কে আমাদের প্রাথমিক ধারণা রাখা প্রয়োজন সেগুলো হচ্ছে- দ-বিধি-১৮৬০, দেওয়ানী কার্যবিধি-১৯০৮ এবং ফৌজদারী কার্যবিধি-১৮৯৮। নিচে এ আইনগুলো সম্পর্কে ধারণা দেওয়া হলো।

দণ্ডবিধি-১৮৬০: দ-বিধি-১৮৬০ আইনটি একটি পরিপূর্ণ মূল আইন। এ আইনে রয়েছে বাংলাদেশে প্রচলিত অপরাধ, অপরাধের বর্ণনা, দ-/শাস্তির বিধান। যেমন যে কোন চুরির সজ্ঞা দ-বিধি-১৮৬০ এর ৩৭৮ ধারায় রয়েছে এবং চুরির ধরন অনুসারে শাস্তির বিধান দ-বিধি ৩৭৯, ৩৮০, ৩৮১ এবং ৩৮২ ধারায় বর্ণনাসহ আইনের বিভিন্ন দিক আলোচনা করা হয়েছে। যা জানা অত্যন্ত আবশ্যক।
দেওয়ানী কার্যবিধি-১৯০৮: দেওয়ানী কার্যবিধি-১৯০৮ আইনটি একটি পরিপূর্ণ পদ্ধতিগত আইন। এ আইনে রয়েছে বাংলাদেশে প্রচলিত দেওয়ানী ব্যাবস্থার পরিপূর্ণ বিষয়াদী। দেওয়ানী বিষয়ের মধ্যে রয়েছে যে কোনো অধিকার সম্পর্কে সংক্ষুব্ধতার প্রতিবিধান। আপনি যদি  কোনো অধিকার বিষয়ে কোনো ধরনের বৈষম্যের শিকার হন তবে দেওয়ানী আদালতের দ্বারস্থ হতে পারেন। যেমন আপনি একটি রেকর্ডীয় জমি ক্রয় করেছেন, বিক্রেতা রেজিস্ট্রি/নামজারী করে দিতে তালবাহানা করছে বা অপারগতা প্রকাশ করছে এমন বিষয় নিয়ে জটিলতায় পড়লে দেওয়ানী কার্যবিধির অধীনে সুনির্দিষ্ট প্রতিকার আইনের ৮ ধারায় দেওয়ানী আদালতে প্রতিকার চাইতে পারেন। দেনমোহর আদায়, সম্পত্তির বিরোধজনিত সমস্যায় নিষেধাজ্ঞার মোকদ্দমাসহ যে কোনো অধিকার বিষয়ে দেওয়ানী আদালতে প্রতিকার পাওয়ার আবেদন করা যায়।

ফৌজদারী কার্যবিধি-১৮৯৮: ফৌজদারী কার্যবিধি-১৮৯৮ আইনটি একটি পরিপূর্ণ পদ্ধতিগত আইন। এই আইনে রয়েছে বাংলাদেশে প্রচলিত ফৌজদারী বিচার ব্যাবস্থার পরিপূর্ণ নিয়মাবলী। দ-বিধির কার্যবিধি হিসেবে মূলত ফৌজদারী কার্যবিধি প্রয়োগ হয়ে থাকে।  ফৌজদারী কার্যবিধিতে বিভিন্ন প্রকার আদালতের শ্রেণিবিন্যাস, গঠন কাঠামো, বিচারকের ক্ষমতা, ম্যাজিস্ট্রেট কোর্ট, জজ কোর্ট, নির্বাহী  ম্যাজিস্ট্রেটের ক্ষমতা-কার্যাবলী, বিচার বিভাগীয় কার্যক্রমে পুলিশের ক্ষমতা-কার্যক্রম ও আইনী পদক্ষেপ হতে সেবা/অব্যাহতি পাওয়ার উপায়সমূহ। যেমন ধারা-৬ এ  আছে সুপ্রীম কোর্ট ও প্রচলিত আইনের অধীনে গঠিত অন্যান্য আদালত ব্যতীত বাংলাদেশে দুই শ্রেণির ফৌজদারী আদালত থাকবে। ক) দায়রা জজ আদালত এবং খ) ম্যাজিস্ট্রেট আদালত। দুই শ্রেণির ম্যাজিস্ট্রেট থাকবে। ক) বিচারিক ম্যাজিস্ট্রেট এবং খ) নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট। বিচারিক ম্যাজিস্ট্রেট নিযুক্ত হন বাংলাদেশ জুডিসিয়াল সার্ভিস কমিশনের নিয়োগকৃত সদস্য হতে  এবং নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট নিয়োগ হন বাংলাদেশ সিভিল সার্ভিস কমিশনের নিয়োগকৃত প্রশাসন বিভাগে যারা সহকারী কমিশনারের অতিরিক্ত দায়িত্ব হিসেবে নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটের দায়িত্ব পান। জেলার নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটগণের প্রধান হলেন জেলা ম্যাজিস্ট্রেট, জেলা প্রশাসক জেলা ম্যাজিস্ট্রেটের অতিরিক্ত দায়িত্ব পালন করে থাকেন।

ফৌজদারী কার্যবিধির ৪৩৫ ধারা অনুসারে সকল নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট জেলা ও দায়রা জজ-এর অধীনস্থ। জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেটের প্রধান হলেন চিফ জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট। চিফ জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেটের অধীনে অতিরিক্ত চিফ জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট, প্রথম শ্রেণির জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট, দ্বিতীয় শ্রেণির জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট এবং তৃতীয় শ্রেণির জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট রয়েছে। প্রত্যেকের পৃথক পৃথক বিচারিক ও দ- দানের ক্ষমতা রয়েছে। মহানগর/ম্যাট্রোপলিটন এলাকায় জজকে মহানগর জজ বলা হয়, মহানগর/ম্যাট্রোপলিটন এলাকায় জজকে মহানগর জজ বলা হয়, চিফ জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেটকে চিফ ম্যাট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট, জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেটকে ম্যাট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট বলা হয়। ম্যাট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট প্রথম শ্রেণির ক্ষমতাপ্রাপ্ত ম্যাজিস্ট্রেট, মহনগর এলাকায় কোনো প্রকার দ্বিতীয় ও তৃতীয় শ্রেণির ম্যাজিস্ট্রেট থাকে না।

আমরা মানুষ যেহেতু আইন দ্বারা সীমাবদ্ধ; তাই প্রতিটি শিক্ষিত ও সচেতন নাগরিককে প্রচলিত আইনসমূহ সম্পর্কে প্রাথমিক ধারণা রাখা দরকার। তবে নিজের আইনী জ্ঞানের বাইরে যে কোনো আইনী ঝামেলায় পড়লে বা আইনী পরামর্শের জন্য আপনি একজন বিজ্ঞ আইনজীবীর সাথে পরামর্শ করে প্রার্থীত প্রতিকার পেতে পারেন।

কামাল হোসেন সুজন: নির্বাহী পরিচালক, ডায়ালগ ফর পিস অব সিএইচটি।

No comments:

Post a Comment