Thursday, August 9, 2018

ছাত্র শিক্ষক অভিভাবক ও পরিবেশ


মো. মনজুরুল হক::
একটি দেশকে বহির্শত্রুর আক্রমণ থেকে রক্ষার জন্য সামরিক শক্তি বৃদ্ধি করা হয়ে থাকে। তেমনি জাতির মেরুদ-কে মজবুত করতে হলে দেশের প্রাথমিক শিক্ষা থেকে শুরু করে উচ্চ শিক্ষা পর্যন্ত সমগ্র শিক্ষা ব্যবস্থাকে মজবুত করা আবশ্যক। পাশাপাশি নৈতিক শিক্ষা ব্যবস্থাও জরুরি। শিক্ষা ব্যবস্থা যত উন্নত হবে, দেশের ফাউন্ডেশনও তত মজবুত হবে। জাতি হিসেবেও উন্নতির শিখরে ওঠা সম্ভব হবে।


শিক্ষা ব্যবস্থার উন্নতি সাধন করতে হলে, ছাত্র শিক্ষক অভিভাবক ও পরিবেশ- এ চারটি উপাদানের একে অপরের পরিপূরক হিসেবে থাক চাই। এ চারটি উপাদানের যে কোন একটি অসম্পূর্ণ থাকলে, সে সমাজে শিক্ষা ব্যবস্থা দুর্বল হয়ে পড়ে। ছাত্র-শিক্ষকের সর্ম্পকটা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ছাত্র-শিক্ষকের মধ্যে আত্মার সম্পর্ক থাকা চাই। বর্তমান ও ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য কী ধরনের শিক্ষা ব্যবস্থা তুলে দিচ্ছি এটি একটি ভাববার বিষয়। প্রাথমিক শিক্ষা ব্যবস্থা নিয়ে কর্তৃপক্ষের আরেকটু ভাবা দরকার। আমাদের শিশুরা কী শিখছে? তারা কতটুকু মজবুত হিসেবে গড়ে উঠছে? শিশুরা মন-মানসিকতায় বর্তমান শিক্ষা ব্যবস্থায় কতটুকু গ্রহণ করছে? তাদের গ্রহণ করার ক্ষমতা কতটুকু আর কতটুকু পড়ার চাপ অভিভাবক-শিক্ষকরা তাদের ওপর চাপিয়ে দিচ্ছি; এসব বিষয়ে আরও পর্যালোচনা ও গবেষণার প্রয়োজন আছে।

আমাদের দেশের প্রাথমিক শিক্ষা ব্যবস্থায় বাংলা ‘বর্ণমালা’র পরিচয় শেখাতে গিয়ে শব্দ চয়ন নিয়েও বিতর্ক হয়। ফলে কোমলমতি শিশুরা দ্বিধা-দ্বন্দ্বে পড়াটাই স্বাভাবিক। তাই পর্যবেক্ষণ, উন্নত প্রশিক্ষণ, সঠিক সিলেবাস প্রণয়ন জরুরি। আমাদের ভুলে গেলে চলবে না, শিশুদের জ্ঞান সীমিত। আর শিশুদের বা শিক্ষার্থীদের এটা বুঝাতে হবে, শিক্ষার মূল উদ্দেশ্য জ্ঞান আহরণ করা। পারিবারিক, সামাজিক, অর্থনৈতিক যতই প্রতিবন্ধকতা থাকুক না কেন শিক্ষার্থীদের জ্ঞান আহরণ যেন ব্যাহত না হয়, সে দিকে লক্ষ রাখা উচিত। আমাদের পরিবেশের সঙ্গে মিলিয়ে তাৎপর্য বোঝার চেষ্টা করা, শিক্ষার্থীদের চিন্তাশক্তি, বুদ্ধিমত্তা, কল্পনা শক্তির প্রচেষ্টায় জ্ঞানের মোমবাতিটি প্রজ্জ্বলিত করে দিতে পারলেই শিশুদের শারীরিক ও মানসিক বিকাশ ঘটবে।

পারিবারিক ও প্রতিষ্ঠানিকভাবে শিক্ষার্থীদের ভুলকে বড় করে না দেখে তা শুধরিয়ে দিতে পারলেই তাদের আত্মবিশ্বাস বাড়বে, আত্মবিশ্বাস প্রবল হলে সামনে এগিয়ে যাবার উৎসাহ পাবে। অনুপ্রেরণার পথের সন্ধান দিতে পারলেই আজকের শিশু আগামী দিনের জনসম্পদে পরিণত হবে।

প্রাতিষ্ঠানিকভাবে পরিকল্পিত শিক্ষা ব্যবস্থা, পর্যাপ্ত জনবল, অবকাঠামো, সঠিক সিলেবাস প্রণয়ন না হলে গৎবাঁধা সিলেবাসের জাঁতাকলে পিষ্ট হয়ে আমাদের শিশুদের উদ্ভাবনী ক্ষমতা শূন্যের কোটায় ঠেকবে। পারিবারিক ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে বুদ্ধিচর্চা বাড়ালে শিশুদের মন সক্রিয় হবে। চিন্তা শক্তি, কল্পনা শক্তি বাড়বে; ফলে উদ্ভাবনী শক্তিও বাড়বে। জীবনবোধ ও জ্ঞানের পরিধি বাড়বে, পাশাপাশি বোধশক্তিরও জাগরণ হবে। শিক্ষার্থীদের পাঠ্যপুস্তকের বাইরেও অন্যান্য বইয়ের জগতের সাথে পরিচয় করিয়ে দিতে হবে। বই পড়ার  উৎসাহ যোগাতে হবে। তা নাহলে এ জাতি জ্ঞান শূন্য হয়ে পড়বে। পারিবারিক লাইব্রেরি গড়ার প্রতি আগ্রহ বাড়াতে হবে। নতুন প্রজন্ম যদি বইয়ের জগতে মগ্ন থাকে তবেই মেধা ও চিন্তার স্বাধীনতাকে প্রসারিত করে তুলতে পারবে। 

প্রাশ্চাত্যের দেশগুলোর শিক্ষা ব্যবস্থা আমাদের দেশ থেকে সম্পূর্ণ আলাদা। শিশু বয়সেই তাদের কল্পনার জগৎ সর্ম্পকে ধারণা দেয়া হয়। সেখানকার শিক্ষকরা শিশুদের চিন্তা-বুদ্ধি আর কল্পনাবোধ বিষয়ে অবিরত উৎসাহ উদ্দীপনা দিয়ে থাকেন। তাই সেসব দেশের শিশুরা জীবনের শুরু থেকেই কল্পনা ও বুদ্ধি শক্তিতে গড়ে ওঠে; আমাদের দেশের শিক্ষা ব্যবস্থা একেবারেই বিপরীত। পশ্চিমা শিক্ষকেরা ছাত্রদের চিন্তা করতে, কথা বলতে অনবরত উৎসাহ যোগান এবং তাদের মতামত গ্রহণ করেন। ছাত্রদের সম্মান-¯েœহ দিয়ে কথা বলেন, এতে শিশুরা আত্মবিশ্বাসী হয়ে ওঠে। আমাদের ভাগ্য নির্মাণে আমাদেরই জেগে উঠতে হবে। কিন্তু জাতির মধ্যে চিন্তা, বুদ্ধির জাগরণ না হলে, আত্মবিশ্বাসী না হলে, আধুনিক বিশ্বের সাথে টিকে থাকতে আমরা পারব কি?

শিক্ষার্থীকে অনবরত উৎসাহ যোগাতে হবে। তোমরা অধ্যয়ন কর, চিন্তা কর, স্বপ্ন দেখো। নিজের দেশ জয় করে পৃথিবীর আকাশ, সমুদ্র, হিমালয় জয় করার স্বপ্ন দেখো; সমাজের কুসংস্কার দূর করার দায়িত্ব আগামীদিনে তোমাদেরই নিতে হবে। দেশের সঠিক হাল ধরার যোগ্যতা অর্জন করতে হবে। দেশকে ভালোবাসতে হবে।

আসল কথা হচ্ছে, শিক্ষা ব্যবস্থায় ছাত্র শিক্ষক অভিভাবক আর পরিবেশের মধ্যে আত্মার একটা সম্পর্ক থাকা চাই। তবেই আমাদের শিক্ষার্থীদের জীবনে সার্থকতা বয়ে আনবে। শিক্ষার্থীরা সফল হলে, শিক্ষক অভিভাবক আর সমাজ তৃপ্তিময় হাসি দেখতে পাবে।

মনজুরুল হক: মাঠসহকারী, একটি বাড়ি একটি খামার প্রকল্প, লংগদু, রাঙ্গামাটি।

No comments:

Post a Comment