Thursday, August 9, 2018

মানুষ ও মনুষ্যের চর্চা


কামাল হোসেন::
মানুষ পৃথিবীর একটি জটিল ও প্রভাবশালী জীব। মানুষ আধ্যাত্মিক প্রাণি, যার কল্পনার জগতের সীমাপরিসীমার মানচিত্র নেই। মানুষের মন দ্বারা শরীরবৃত্তীয় কর্মকা- নিয়ন্ত্রিত; মন, বুদ্ধি, বিবেকে বোধের সমষ্টিগত রূপ; যা অনুভূতি, ইচ্ছা, কল্পনার মাধ্যমে প্রকাশিত হয়। যার আলাদা কোনো সত্ত্বা নেই, কিন্তু ব্যক্তির আচরণের মাধ্যমে বাহ্যিকতা ফুটে ওঠে। মানুষের ভাব আছে তাই সে ভাবুক, আর ভাব হলো চিরন্তন, অভিনশ্বর, অনন্ত। ভাবের মাধ্যমে মানুষ আধ্যাত্মিক হয় ও পরমাত্মার উপলব্ধি করে। তাকে আশরাফুল মাকলুকাত বলে। মানুষের বৈজ্ঞানিক নাম হোমো সেপিয়েন্স এর দ্বিতীয় অংশ সেপিয়েন্সের অর্থ বিজ্ঞ। আবার মানুষের আরেক নামের সাথে আমরা সকলে পরিচিত, আর তাহলো ‘ইনসান’; যার অর্থ ভুলে যাওয়া, ভুল করা। অর্থাৎ ভুলে যাওয়া আর ভুল করাও মানুষের বিশেষ মানবীয় গুণ। 

মানুষ যদি রাগ, হিংসা, বিরহ, বিবাদ, ভুলে যেতে নাপারত তবে পৃথিবী এত সুন্দর হতো না, আবার ভুল করে মানুষ শিখে, ভুলের মাধ্যমে সংশোধিত হয়, ভুলের কারণে ক্ষমার মতো মহৎ গুণ আছে। দুঃখ-কষ্টের মাঝেও মানুষ হাসতে জানে। এত্ত কিছুর পরেও কিছু মানুষকে আমরা অমানুষ বলি কেন? উপরে যা বলা হয়েছে, তাতে মানুষের জ্ঞানের প্রাধান্যই দেওয়া হয়েছে। মানুষের স্থায়ী স্মৃতি শক্তির কারণে দীর্ঘ শত্রুতা, অপকাজ, অপরের অকল্যাণ করতে পারে, অনিষ্ট বা ক্ষতি করার ক্ষেত্রে প্রাণির ক্ষোভ খুব অল্প সময় স্থায়ী হয়, যার দয়া নেই তারধর্ম ও মনুষ্যত্ব কোনটাই নেই, মানুষ মানুষের উপর শিকারীর ভূমিকায় অবতীর্ণ হলে তখনই তাকে অমানুষ বলে। মানুষের সকল প্রকার মানবীয় ভালো গুণের সমষ্টিকে মনুষ্যত্ব বলে, মনুষ্যত্ব বিবেকের উন্নত সাড়া। কিন্তু স্থান, কাল, পাত্র ভেদে ব্যক্তির বিবেক দুর্বল হয়ে যায়। প্রত্যেকটা অন্যায়-অপরাধকে মানুষ আগে দুর্বল বিবেক দ্বারা নিজের কাছে বৈধ করে নেয়, যেমন ডাকাতি, ঘুষ, দুর্নীতি, ইভটিজিং, কিংবা অন্যকোন খারাপ কাজÑ যাকে একবাক্যে দেশের সবাই স্বীকার করবেন, বিচারও চাইবেন, কিন্তু উক্ত অপরাধীর বিচার বিচারক যেভাবে করবেন, তার আপনজন সেভাবে করবেন না।

বিবেকের এই দুর্বলতা, লোভ, স্বার্থপরতা, পরিশ্রীকারতা, মানুষকে যখন বেশি আকৃষ্ট করে তখনি মানুষের মনুষ্যত্ব লোপ পায়, মানুষ অমানুষ, নামানুষ, বদ মানুষে পরিণত হয়। অর্থাৎ আমারে আমি যখন আমার আপনার করে ভাবি, তখনি অপরাধ আমার মাঝে বৈধতা পায়, আর আমারে পরের করে চিন্তা করলে তা হবার নয়, মানুষের পৃথিবী মানুষকেই সুন্দর রাখতে হবে, উপর থেকে যা হবার তা হয়েগেছে। সকল প্রকার মানবিক দায়িত্ববোধই মনুষ্যত্বের চর্চা। ব্যক্তিগত জীবন, পারিবারিক, সামাজিক এবং পরিবেশিক জীবনে মনুষ্যত্বের পরিচয় দিতে পারে। সামাজিক দিক থেকে মানুষ মর্যাদায় ভিন্ন হলেও, অধিকারের দিকে সবাই সমান। মনুষ্যত্ব চর্চা হয় মানুষের প্রতি সহমর্মিতা, অন্যায়ের প্রতিবাদ, সত্য ও ন্যায় প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে। যে অপরাধ করে সেও মানুষ আবার যে প্রশ্রয় দেয় অথবা প্রতিবাদ করে সেও মানুষ, চোখের সামনে অন্যয় হচ্ছে, বিপদে পড়ছে, মরে যাচ্ছে, আপনি তামাশা দেখছেন, নিরবে কেটে পড়ছেন, তাতে মনুষ্যত্বের পরিচয় দিলেন না। আপনার জীবনেও একই ঘটনা ঘটতে পারে। তখন কেঁদেও পার পাবেন না, একটা উদাহরণ দিয়ে স্পষ্ট করি, এক ব্যক্তি নদীর পাড় দিয়ে হাঁটার সময় দেখলেন যে, অনেকগুলো ছেলে সাঁতরে নদী পার হচ্ছে, পিছনে পড়া কয়েকজন আর পারছিল না; তাই সাহায্য চেয়ে আকুতি করছিল। ব্যক্তিটি তামাশা দেখে বাড়ি যেতে না যেতেই জানতে পারেন ডুবে যাওয়া দু’জনের একজন তার নিজের সন্তান।

মানুষ মানুষের জন্য মানুষ পৃথিবীর সব কিছুর জন্য, যদি ধর্ম মানেন তবে জানবেন মানুষের জন্যই এত লীলা-বিলাস। আর যদি নামানেন, নিরবে একটু ভেবে দেখুন, নানান যুক্তিতে আপনিই সেরা। আর যিনি মনুষ্যত্বের চর্চা করেন তিনি বহুর মধ্যে সেরা।

কামাল হোসেন :সহকারী শিক্ষক, আমতলী উচ্চ বিদ্যালয়, বাঘাইছড়ি।

No comments:

Post a Comment