Thursday, August 9, 2018

পাহাড়ের কান্না


মো. সিরাজুল ইসলাম::
ময়মনসিংহ জেলাধীন ত্রিশাল ধলা গ্রামে জন্মগ্রহণ করা হতদরিদ্র মো. আবদুল বারেক ও সহধর্মিণী রাবেয়া খাতুন, সংসার জীবনে তারা পাঁচ সন্তানের জনক-জননী। সন্তানদের ভবিষ্যৎ সুখের আশায়, সুখের স্বপ্ন দেখে সপরিবারে ১৯৭৯ সালে পাড়ি জমান চট্টগ্রামের দুর্গম পাহাড়ী জনপদ রাঙ্গামাটির লংগদু উপজেলার গুলশাখালীর রসুলপুর গ্রামে। যেখানে চিকিৎসা ও শিক্ষা ব্যবস্থার কোনো সুযোগ-সুবিধা ছিল না। ছিল না কোনো কর্মসংস্থান। নিত্য প্রয়োজনীয় খাবার সামগ্রীও পাওয়া যেত না। নানা প্রতিকূলতার মাঝে সংগ্রাম করে বেঁচে থাকার জন্য জীবিকানির্বাহ করতে প্রতিদিন ছুটে যেতেন আবদুল বারেক বিভিন্ন স্থানে। উপার্জনের সামান্য টাকায় নুন, আটা, তেল কিনে কোনভাবে সংসার চলত। কিছুদিন পরই ডায়রিয়া হয়ে চিকিৎসার অভাবে মারা যায় আবদুল বারেকের বড় সন্তান মো. নুরুল ইসলাম। সেই থেকেই শোক যেন বাসা বাঁধে আবদুল বারেক ও রাবেয়া খাতুনের সংসারে।
সংসার জীবনের পরবর্তী প্রায় একযুগ সময়ে এক কন্যা ও তিন পুত্র সন্তানের সবাইকে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ করেন। উপযুক্ত হওয়ার পর ছেলেরাও রোজগার করতে শুরু করলে সুখের সংসার শুরু হয় আবদুল বারেক ও রাবেয়া খাতুনের। তখন পাহাড়ে বাঁশ, বেত, শণ, গাছ কাটা এবং নদীতে মাছ ধরাই ছিল আয়ের উৎস। সেই উৎসকে পুঁজি করে পার্বত্য অঞ্চলে পাহাড়ি সশস্ত্র সন্ত্রাসীরা মোটা অংকের চাঁদা আদায়ের পাশাপাশি বাঙালি নিধনের নীল নকশা আঁকতে থাকে। ১৯৯৬ সালের ৯ সেপ্টেম্বর পাকুয়াখালীতে গাছ কাটতে গিয়ে পাহাড়ি সশস্ত্র সন্ত্রাসীদের দ্বারা তৈরি হত্যার নীল নকশায় আটকা পড়ে আবদুল বারেক ও রাবেয়া খাতুনের দুই সন্তান। সেদিন একই সাথে সন্ত্রাসীদের অস্ত্রের আঘাতে মৃত্যুর স্বাদ গ্রহণ করে ৩৫ জন নিরীহ বাঙালি কাঠুরিয়া, তাদের মাঝেই ছিল আবদুল বারেকের দুই সন্তান মো. আলী হোসেন ও মো. দুলাল হোসেন। শোকের ছায়ায় যেন চারদিক চিরতরে ঢেকে যায় আব্দুল বারেক ও রাবেয়া খাতুনের। বৃদ্ধ মা-বাবাকে দেখাশোনার জন্য দ্বিতীয় পুত্র নবী হোসেন ছাড়া আর যে কেউ রইল না তাদের সংসারে।

১৯৯২ সালের দিকে মা-বাবা আনুষ্ঠানিকভাবে নবী হোসেনকে একই গ্রামের ইয়াকুব আলী লিডারের কন্যা হাজেরা বেগমকে বিয়ে করান। সংসার জীবনে নবী হোসেন তিন পুত্র ও দুই কন্যা সন্তানের বাবা। ১৯৯৬ সালের ৯ সেপ্টেম্বর পাকুয়াখালী ট্রাজেডিতে দুই ভাইকে হারিয়ে দিশেহারা হয়ে পড়েন নবী হোসেন। বৃদ্ধ মা-বাবার পাশাপাশি আত্মীয়-সজন, আপনজন, স্ত্রী-পুত্র সকলের ভরণ-পোষণের দায়িত্বভার বহন করার মতো নবী হোসেন ছাড়া আর যে কেউ নেই। সংসারের হাল ধরতে গিয়ে ১৯৯৯ সালের দিকে নিরাপদ স্থান প্রিয় শহর রাঙ্গামাটি পৌরসভার পুলিশ লাইন এলাকায় ভাড়া বাসায় ব্যাচেলর হিসেবে পাড়ি জমালেন নবী হোসেন। শহরে এসে নবী হোসেনের জীবনমান উন্নয়নের স্বপ্ন দু’চোখে ভেসে উঠতে থাকে। অধিক আয়ের উৎস হিসেবে ট্যাক্সি চালক হবেন ভেবে শুরু করেন অন্য কর্মের পাশাপাশি ড্রাইভিং প্রশিক্ষণ। ড্রাইভিং লাইসেন্স করে ভাড়ায় চালিত ট্যাক্সি নিয়ে প্রিয় শহর রাঙ্গামাটির রাজপথে শুরু করেন নতুন জীবন। অল্পদিনেই একজন আদর্শ ও দক্ষ ট্যাক্সি ড্রাইভার হিসেবে পরিচিতি লাভ করেন। আয়-রোজগারও বাড়ে। বৃদ্ধ মা-বাবাকে কাছে রাখতে এবং সন্তানদের শিক্ষা নিশ্চিত করার আশায় শহরেই বসবাস করার সিদ্ধান্ত নেন। ২০০৭ সালের প্রথমদিকে সপরিবারে চলে আসেন পর্যটন নগরী রাঙ্গামাটির তবলছড়িতে। ভাড়া বাসায় থেকেই ছেলেমেয়েদের স্কুলে ভর্তি করেন। ২০০৭ সালের শেষের দিকে উপার্জনকৃত টাকা দিয়ে ভেদভেদী টেনিস কোর্ট এলাকায় জায়গা কিনে সেখানেই স্থায়ীভাবে বসবাস শুরু করেন নবী হোসেন ও স্ত্রী হাজেরা বেগম। ভাগ্য যেন ফিরতে শুরু করে তাদের। এর মধ্যেই ২০১০ সালে বৃদ্ধ বাবা এবং ২০১৪ সালে মা মারা যান নবী হোসেনের। মা-বাবাকে হারিয়ে এতিম নবী হোসেন শোকের ছায়ার মাঝেও সংসারের হাল ধরে রাখেন।

২০১৩ সালের প্রথমদিকে বিজিবিতে অংশগ্রহণ করে নবী হোসেনের প্রথম পুত্র মো. রুবেল হোসেন ও একই বছরের মাঝামাঝিতে বিয়ে দেন দ্বিতীয় সন্তান রুমা আক্তারকে। ২০১৪ সালে রুমার কোল আলো করে জন্ম নেয় শিশু সোহানা। সারাদিনের ড্রাইভ করা পরিশ্রম নিয়ে বাসায় ফিরে নানা ডাক শুনে ক্লান্তি দূর করার আশায় বাড়িতেই রাখেন মেয়ে, জামাই ও আদরের ফুটফুট নাতনী সোহানাকে। প্রতিদিন ট্যাক্সি চালানোর পাশাপাশি পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ আদায় করতেন নবী হোসেন। অন্যদিকে স্ত্রী হাজেরা বেগম ঘরের রান্নাবান্না সেরে স্কুলে পাঠাতেন নবম শ্রেণিতে পড়ুয়া সন্তান রুনা আক্তার ও সপ্তম শ্রেণিতে পড়ুয়া সোহাগ হোসেনকে। ২৮ মে ২০১৭ পবিত্র রমজান মাস উপলক্ষে স্কুল বন্ধ হওয়ায় রুনা ও সোহাগ বাসাতেই সময় কাটাত। অপরদিকে ঈদের পরেই দ্বিতীয় সাময়িক পরীক্ষা শুরু হবে, তাই বাড়ি যাওয়া হয়নি কলেজ পড়ুয়া লজিং মাস্টার শরিফুল ইসলামের।

১ মে ২০১৭ হতেই রাঙ্গামাটি সর্বোচ্চ তাপমাত্রা রেকর্ড গড়ার ফলে পৌর এলাকার মানুষজন প্রচ- গরমে অস্থির হয়ে পড়েন। কিন্তু ২৮ মে ২০১৭ (পহেলা রমজান) পুরো আকাশ যেন মেঘে ঢেকে যায়, শুরু হয় হালকা বৃষ্টি। গরমের তীব্রতা কেটে গিয়ে সহনীয় পর্যায়ে আসে তাপমাত্রা, রাঙ্গামাটিবাসী যেন সস্তির নিঃশ্বাস ফেলার সুযোগ পায়। কিন্তু কে জানতো এই সস্তির বৃষ্টিই কেড়ে নিবে শতাধিক মানুষের তাজা প্রাণ! ১২ জুন ভোরে আবহাওয়া অধিদপ্তর ৩ নম্বর সতর্কতা সংকেত জারি করে, চারদিক অন্ধকার করে নেমে আসে প্রবল বৃষ্টি, বইতে থাকে হালকা বাতাস। মনে হচ্ছিল যেন, আকাশ আর সাগর এক হয়ে বৃষ্টির প্রতিযোগিতায় নেমেছিল রাঙ্গামাটিবাসীর উপর। দুই দিনের টানা ভারী বর্ষণে লেক পানিতে কানায় কানায় ভরপুর। ১৩ জুন ভোররাতে ভারী বর্ষণের ফলে পাহাড় ধসে মানুষ হতাহতের আশঙ্কা থাকায় সাহরি খেয়ে লোকজনদের সতর্ক করতে মাইকিং করে বলার জন্য পাশের মসজিদে ছুটে যান নবী হোসেন। মসজিদের মাইকে সতর্কতার ঘোষণা দিয়ে নবী হোসেন বাসায় এসে পরিবারের সবাইকে সতর্ক করে বারান্দার চৌকিতে বসে সময় কাটাতে থাকেন। ভোর ৩.৩০টা হতে প্রবল বর্ষণের সাথে শুরু হয় বিকট গর্জনে বজ্রপাত। বজ্রপাতের তীব্র শব্দে পুরো শহর যেন থরথর করে কাঁপতে শুরু করে, শুরু হয় পাহাড় ধস। মারাত্মক পাহাড় ধসে মাটিচাপা পড়ে পাঁচ শতাধিক বাড়িঘর ও ঘরে থাকা অসংখ্য লোকজন। উদ্ধারকর্মীরা গুরুতর আহত অবস্থায় নবী হোসেন ও ছেলে আবদুল্লাহ আল মামুনকে জীবিত উদ্ধার করলেও বাকিরা হারিয়ে যায়। রাঙ্গামাটি জেনারেল হাসপাতাল যেন পরিণত হয় লাশের আস্তানায়। সময় বাড়ার সাথে সাথে স্বজন হারাদের আর্তনাদে হাসপাতালের চারপাশ ভারী হয়ে আসতে থাকে। উদ্ধার অভিযান চালাতে গিয়ে দু’জন কর্মকর্তাসহ নিহত হয় পাঁচ সেনা সদস্যও। ১৩৫ জনের মৃত্যুর মিছিলে যোগ হয় নবী হোসেনের স্ত্রী হাজেরা বেগম, ছেলে সোহাগ হোসেন, মেয়ে রুনা আক্তার, রুমা আক্তার, আদরের নাতনী সোহানা ও লজিং মাস্টার শরিফুল ইসলাম।

চিকিৎসাধীন ছেলে আবদুল্লাহ আল মামুন সুস্থ হয়ে ফিরে এলেও আশঙ্কাজনক হয়ে পড়ে নবী হোসেনের অবস্থা। উন্নত চিকিৎসার জন্য ১৬ জুন ২০১৭ নিয়ে যাওয়া হয় ঢাকার ইডেন মাল্টিকেয়ার হাসপাতালে। কিন্তু শেষ রক্ষা হয়নি। টানা ছয়দিন বেঁচে থাকার সংগ্রাম করে অবশেষে ১৮ জুন সকাল ৮.৩০টায় মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়েন নবী হোসেন। আবদুল বারেক ও রাবেয়া খাতুনের চার ছেলেকেই কেড়ে নিল পাহাড়। এক ছেলে বিনা চিকিৎসায়, দুই ছেলে সন্ত্রাসীদের হাতে নিহত হওয়ার পর নবী হোসেনও চলে গেল পাহাড় ধসের কবলে পড়ে। বংশের প্রদীপ হয়ে বেঁচে রইল রুবেল হোসেন ও আবদুল্লাহ আল মামুন, শোকার্ত এতিম দুটি সন্তান।

সিরাজুল ইসলাম: সভাপতি, কার্যকর কমিটি, ফরমার স্টুডেন্টস অ্যাসোসিয়েশন অব গুলশাখালী।

No comments:

Post a Comment