Friday, August 17, 2018

আমাদের শৈশব



মো. আনিছুর রহমান (রতন):
আধুনিক তথ্য প্রযুক্তির এ যুগে সবাই বিভিন্ন আধুনিক ডিভাইস ও অনলাইন নিয়ে ব্যস্ত। সব কিছুই এখন কৃত্রিমতায় ভরপুর। শিক্ষিত পরিবারের শিশুরা তো সারাদিনই ব্যস্ত থাকে লেখাপড়া নিয়ে। বন্ধের দিন যে সময়টুকু থাকে বিনোদনের জন্য তাও কাজে লাগান অভিভাবকরা। কখনও নাচের ক্লাস, কখনও গানের ক্লাস, কখনও চিত্রাঙ্কন ইত্যাদি। তাই আজকের শিশুরা প্রকৃতি দেখার সুযোগ পায় খুবই কম। অথচ দেড় যুগ আগেও আমাদের শৈশব কেটেছে ভিন্নভাবে। তখন ঘরে ঘরে টিভি, স্মার্ট ফোন, ল্যাপটপ, গেমস ডিভাইস ছিল না। আমাদের সকাল হতো পাখির ডাক শুনে, সারাদিন কাটত প্রকৃতির সাথে। বৃষ্টিতে ভিজে, রোদে শুকিয়ে এবং খেলাধুলা করে সন্ধ্যা নামতো আমাদের। 


গ্রামের মাটির ঘর, বাঁশের বেড়া ও শণের চাল, চারপাশে ঘন সবুজ প্রাকৃতিক দৃশ্য; এর মাঝেই বড় হয়েছি। শৈশব-কৈশোরের দুরন্তপনা আর ডানপিটে জীবন প্রায় সকলেরই ছিল। বন্ধুরা মিলে দল বেঁধে সকালে মক্তবে যাওয়া, স্কুলের ক্লাস শুরুর আগে এলোমেলো দৌড়ঝাঁপ, গোল্লাছোট, কাবাডি, দাঁড়িয়াবান্ধা, কানামাছি, বৌছি খেলার দিনগুলি এখন শুধুই স্মৃতি।

বাবা সরকারি চাকুরির সূত্রে দেশের বিভিন্ন জায়গায় থাকতেন, সেই সাথে আমাদেরও। একবার যেতে হয়েছিল কুড়িগ্রামে। আমি খুব ছোট; বাবার সাথে আমরা দুই ভাই চলে গেলাম সেখানে। এক মাদরাসায় ভর্তি করা হলো। কিন্তু মাদরাসায় আমার পড়াশোনা হচ্ছিল না। ফিরে এলাম আবার সেই চির চেনা নিজের এলাকায়। আসতে না আসতেই আবার সিদ্ধান্ত হলো, যেতে হবে ঢাকায়। যাওয়ার সময় আনন্দই হচ্ছিল, কিন্তু খারাপ লাগছিল বন্ধুদের জন্য। ঢাকায় স্বনামধন্য এক স্কুলে ভর্তি করা হলো; সে স্কুলের পড়ালেখার চাপ আর কঠিন নিয়ম-কানুন আমার সহ্য হচ্ছিল না। তাই বায়না ধরে দাদীর সাথে চলে আসি গ্রামে। শৈশবের বাকী সময় কেটেছে দাদী আর চাচা-চাচীর কাছেই। চাচা-চাচী ভাবতেন, হয়তো দুষ্ট ছেলেমেয়েদের সাথে মিশে আমিও দুষ্ট হয়ে যেতে পারি। তাই চোখে চোখে রাখতেন। আর আমি সুযোগ পেলেই পালিয়ে যেতাম খেলার জন্য। সেক্ষেত্রে বন্ধুদের সাহায্যও নিতে হতো। খেলাধুলা করতাম ঠিকই কিন্তু ভয়ে থাকতাম, কখন আমাকে দেখে ফেলে। পুরো ব্যাপারটাই ছিল রোমাঞ্চকর।

বন্ধুরা মিলে কখনও কখনও বের হতাম পাখির সন্ধানে। খেয়াল করতাম, কোন পাখি ঠোঁটে করে শণ অথবা বাচ্চাদের জন্য খাবার নিয়ে যাচ্ছে। এসব দেখে পাখিদের পিছু নিতাম। এভাবে সহজে পেয়ে যেতাম পাখির বাসা। বাসায় পাখির ছানা থাকলে পর্যবেক্ষণে রাখতাম। বাচ্চাগুলো কখন বড় হয়। কিন্তু এক কান দুই কান করতে করতে এক সময় খবর ছড়িয়ে পড়তো। তারপর শুরু হতো মালিকানা নিয়ে প্রতিযোগিতা। কেউ বলতো আমি আগে দেখেছি, আরেকজন বলতো আমি আগে দেখেছি।

দল বেঁধে সাঁতার কাটা ও মলই খেলা ছিল নিত্যদিনের ব্যাপার। এমনও হতো, সারাদিন পানিতেই কেটে যেত। খাবারের কথাও ভুলে যেতাম। খেলতে খেলতে দুপুর পার করে হয়তো বিকাল বেলা সারা শরীরে শেওলা মাখিয়ে ও চোখ লাল করে ঘরে ফিরতাম। চোখের লাল কাটানোর জন্য কত কিছু না করতাম। খালের পাড়ে ঢালু জায়গা পিচ্ছিল করে সেখানে একের পর এক পিছলিয়ে পানিতে গিয়ে পড়তাম। এটি ছিল খুবই জনপ্রিয় খেলা। অভিভাবকদের ভয়ে ভিজা কাপড় রোধে দাঁড়িয়ে শুকিয়ে তারপর ঘরে ফিরতে হতো।

কঞ্চি বাঁশ দিয়ে তৈরি করা বন্দুক (স্থানীয় ভাষায় ফট্টাশি) বানিয়ে তার ভেতর এক ধরনের গাছের বিচি ভরে গুলি ছুটাতাম। অনেক সময় দুই দলে বিভক্ত হয়ে গোলাগুলি করতাম। গুলি (ধাতই বিচি) সংগ্রহ করতে গিয়ে জঙ্গলে ঢুকে যেতাম। সেখানেও চলতো প্রতিযোগিতা। কার আগে কে বেশি বিচি সংগ্রহ করতে পারে।

স্কুল বন্ধের দিনে আট-দশজন মিলে চলে যেতাম বড়শি দিয়ে মাছ ধরতে। মাছ ধরার মূল উপকরণ আশপাশের জঙ্গল থেকেই বোলতার বাসা ভেঙে সংগ্রহ করতাম। এ জন্য অবশ্য প্রায় সময় বোলতার কামড় খেয়ে প্রচ- ব্যাথায় কাতরাতে হতো।

মনে পড়ে, বিটিভিতে শক্রবার সন্ধ্যায় ‘আলিফ লায়লা’ প্রচার হতো। সে সময় ‘আলিফ লায়লা’ দেখেনি এমন কাউকে খুঁজে পাওয়া কষ্টকর হবে। ছোট-বড় সবাই দলে দলে ছুটে যেত আলিফ লায়লা দেখতে। কতদিন যে আলিফ লায়লা দেখার জন্য ঘর থেকে পালিয়েছি তা বলে শেষ করা যাবে না। একদিন তো ঘরের বন্ধুরা মিলে জানালা ভেঙে আমাকে আলিফ লায়লা দেখতে সাহায্য করেছিল। অনেক সময় দেখা যেত, যে বাড়িতে টিভি আছে সে বাড়িতে প্রবেশাধিকার থাকত না। তখন ঘরের চারপাশে ঘুর ঘুর করতাম। আর সুযোগ পেলেই জানালা দিয়ে উঁকি মারতাম।

প্রতিটা শুক্রবার ছিল এক একটা উৎসবের দিন। কাক্সিক্ষত সেই দিন কখন আসবে তার হিসাব রাখতাম এবং দল বেঁধে টিভিতে ছায়াছবি দেখতে যেতাম। এলাকায় মাত্র কয়েকটি টেলিভিশন ছিল। টেলিভিশনে ছায়াছবি দেখতে দুই টাকা লাগত। সেই দুই টাকা আমাদের কাছে অনেক মূল্যবান ছিল। টিফিনের টাকা বাঁচিয়ে টিভি দেখার জন্য সঞ্চয় করে রাখতাম। সুখ-দুঃখ, হাসি-কান্না, শাসন-আদর, দুরন্তপনায় ভরপুর স্মৃতিময় সে শৈববের কথা আসলেই ভোলা যায় না।

আনিছুর রহমান (রতন): সহকারী শিক্ষক, সীমান্ত প্রহরী আদর্শ নিম্ন মাধ্যমিক বিদ্যালয়।

No comments:

Post a Comment