Thursday, August 9, 2018

ঘুরে এলাম বাংলার দার্জিলিং



মো. ফারুক হোসেন::
ঔপন্যাসিক সুনীল গঙ্গোপাধ্যয় বলেছিলেন, আমাকে যদি পাহাড় ও নদীর মধ্য একটিকে বেছে নিতে বলে তবে আামি পাহাড়কেই বেছে নিব। বাংলাদেশের সর্বত্র নদী ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকলেও পার্বত্য চট্টগ্রাম ব্যতীত পাহাড় খুব বেশি দেখা যায় না। তাই স¦ভাবতই এ দেশের মানুষের পাহাড়ের প্রতি আকর্ষণটা বেশি। আমার জন্ম পাহাড়ে, তবুও মন ভরে পাহাড় দেখার স্বাদ কখনোই কমেনি। যখনই সুযোগ পেয়েছি ছুটে গিয়েছি পাহাড়ের সৌন্দর্য্য দেখতে। পাহাড়ের নয়নাভিরাম সৌন্দর্য্য ও আঁকা-বাকা পথ আমার মনে এক ধরনের শিহরণ জাগায়। বাংলাদেশের অন্যতম জনপ্রিয় একটি পর্যটন কেন্দ্র হলো সাজেক ভ্যালি। যেখানে মেঘ আর রৌদ্রের লুকোচুরি খেলা খুব কাছ থেকে দেখা যায়।

অনেক সৌন্দর্য্য পিপাসু পর্যটক যাকে বাংলার দার্জিলিং নামেও অভিহিত করেন। সত্যিই তো, আমাাদের সাজেক রূপে গুণে দার্জিলিংয়ের চেয়ে কম নয়। রাঙ্গামাটি জেলার বাসিন্দা হয়েও দীর্ঘদিন ইচ্ছা থাকার পরেও সময় সুযোগের অভাবে সাজেক যাওয়া হয়নি এতোদিন। গত শীতে সেই সুযোগ চলে এলো। কয়েক বন্ধুর আহ্বানে বাঘাইছড়ি বেড়াতে গিয়ে রাতের বেলা উন্নয়ন বোর্ডের রেস্টহাউজে বসে আড্ডা দিচ্ছিলাম। হঠাৎ বন্ধু হেলাল প্রস্তাব করে ‘চল সাজেক ঘুরে আসি’। আমারও ইচ্ছা ছিল প্রবল, তাই সুযোগটা হাতছাড়া করতে চাইনি। পরদিন সকালেই বন্ধুদের কাছ থেকে তিনটি মোটরসাইকেল সংগ্রহ করে যাত্রার জন্য প্রস্তুতি নিই। দুপুরের খাবারের জন্য স্থানীয় হোটেল থেকে প্যাকেট বিরানি সাথে নিলাম। সাথে নিলাম পর্যাপ্ত শীতের কাপড়ও। সকাল আটটার দিকে রওয়ানা দিলাম। তখনও কুয়াশা কাটেনি। সমস্যা হলো, নয় জনের দলে ভালো করে বাইক চালাতে জানি মাত্র তিন জন। আঁকাবাকা পাহাড়ি রাস্তায় যেন-তেন ড্রাইভারের হাতে গাড়ি তুলে দিলে দুর্ঘটনা নিশ্চিত। কাজেই আমার ওপর দায়িত্ব চাপলো পেছনে দুজনসহ মোটরসাইকেল চালাতে হবে। কিন্তুু আমার জন্য বাঘাইছড়ি-সাজেক রাস্তাটি ছিল অপরিচিত। তাই প্রথমে কিছুটা ইতস্তত বোধ করছিলাম। পরে
বন্ধুদের অনুরোধে দ্বায়িত্ব নিতেই হলো। ভেতরে ভেতরে কিছু ভয় কাজ করছিল।

স্টিল ব্রিজ পার হতেই সামনে অল্প দূরত্বের রাস্তা দেখা যাচ্ছিল, আর বাকিটুকু ঘন কুয়াশায় ঢাকা। খুব সাবধানে ড্রাইভ করতে হচ্ছিল। আমি সামনের জনকে অনুসরণ করে চলছি। পাহাড়ি রাস্তায় ছোট যানবাহনে খুব সাবধানতা অবলম্বন করতে হয়। কারণ বিপরীত দিক থেকে আসা বড় যানবাহনগুলো পাহাড়ের মোড়ে ঠিকমতো হরণ বাজায় না। একটু অসতর্ক হলেই যে কোন সময় বড় ক্ষতি হতে পারে। এভাবে যাওয়ার পর বাঘাইহাট সেনা জোনের গেটে পৌঁছলাম। হেলাল নামলো চেকপোস্ট থেকে অনুমতি নিতে। সাধারণত সাজেকে কোনো পর্যটক যেতে চাইলে নিরাপত্তার কারণে বাঘাইহাট সেনা জোনের চেকপোস্টে বিস্তারিত পরিচয় দিয়ে অনুমতি নিতে হয়। মিনিট পাঁচেক পরেই আমরা অনুমতি পেয়ে গেলাম। আবার যাত্রা শুরু। যতদূর এগিয়ে যাই ততই মনে হচ্ছে ভিন্ন কোনো দেশে চলে যাচ্ছি। কুয়াশার চাদর ভেদ করে সকালের সোনালী আলো পাহাড়ের ভাঁজে ভাঁজে ঠিকরে পড়ছে। প্রকৃতি যেন ঘুম ভেঙে জেগে ওঠছে। পাহাড়ের বাঁকে বাঁকে সাপের মতো এঁকেবেঁকে চলা রাস্তাটিকে অসাধারণ লাগছিল। দুই পাশে সারি সারি পাহাড় আর তার মাঝখান দিয়ে এগিয়ে চলছে জনমানবহীন রাস্তা। অনেক্ষণ পর পর দেখা মিলছে দু-একটি জিপ গাড়ির। এখানে স্থানীয় পাহাড়িÑবাঙালিদের চলাফেরার প্রধান মাধ্যম হলো এই জিপ গাড়ি আর মোটর সাইকেল। মাঝে মাঝে দেখা মিলছে দু-একটি পাহাড়ি গ্রামেরও। রাস্তার পাশে দাঁড়িয়ে থাকা ছোট শিশুরা হাত নাড়ছে। আরো আধ ঘণ্টা চলার পর পৌঁছলাম বাঘাইহাট বাজার। যেখানে পাহাড়িদের পাশাপশি পর্যাপ্ত বাঙালি ব্যবসায়ীদের দোকান-পাট রয়েছে। রাস্তার পাশে গাড়ি থামিয়ে চা খাওয়ার জন্য নামলাম।

স্থানীয়দের সাথে কিছু আলাপের ফাঁকে দেখে নিলাম, বাজারের পাশ দিয়েই বয়ে চলছে কাচালং নদী। গঙ্গারাম হয়ে সেটি আরো উপরে উঠে গেছে। এখানে নদীর সরুতা ও শুষ্কতা দেখেই বুঝা গেল কাচালং যেই লুসাই পাহাড় থেকে উৎপন্ন হয়েছে তা আর খুব বেশি দূরে নয়। আবার বের হয়ে পড়লাম। গঙ্গারাম থেকে সাজেক পর্যটন কেন্দ্র খুব বেশি দূরে নয়। যত যাচ্ছি মনে হচ্ছে পাহাড়ের উচ্চতা বাড়ছে। সাজেকের প্রায় কাছাকাছি চলে আসার পরেও জানা ছিল না আমার জন্য কী অপেক্ষা করছে। সাজেক পাহাড়ে যেখানে সেনাবাহিনীর তত্ত্বাবধানে রুইলুই পর্যটন কেন্দ্র তৈরি করা হয়েছে তা মূল ভূখ- থেকে প্রায় আঠারোশ’ ফুট উপরে। নিচ থেকে এ পাহাড় এতটাই খাঁড়া যে যেকোন যানবাহন উঠতে খুবই কষ্টকর। মূলত সাজেক রাস্তাটি সেনাবাহিনীরাই করেছিল। এত ঝুঁকিপূর্ণ কাজ সেনাবাহিনী ছাড়া হয়তো সম্ভবই হতো না। সাজেক রাস্তা হওয়ার আগে সেখানে প্রায়ই দুর্ভিক্ষের খবর শুনতাম। এসব এলাকা এতটাই দুর্গম ছিল যে হেলিকপ্টার ছাড়া কোনো কিছুই পৌঁছানো সম্ভব হতো না। কিন্তুু আজকের যে জনপ্রিয় সাজেক পর্যটন কেন্দ্র, তা বাংলাদেশের গর্বিত সেনাবাহিনীরই অবদান। যাহোক ঝুঁকি নিয়ে কষ্ট করে উঠে পড়লাম পাহাড়ের উপর, পৌঁছে গেলাম পর্যটন কেন্দ্রের মূল গেইটে। বেলা তখন এগারোটা, পাহাড়ের চূড়ায় দাঁড়িয়ে মনে হচ্ছে, আকাশের খুব কাছাকাছি চলে এসেছি। চারপাশটা ঘুরে দেখতে থাকলাম। যত দেখছি ততই নেশার মতো লাগছে। সৌন্দর্য্য যেন ঠিকরে পড়ছে চারদিকে। রুইলুইয়ে দাঁড়িয়ে সীমান্ত এলাকায় ভারতের একটি বাজারও দেখা যাচ্ছে। পাহাড়ের ছেলে আমি, তবুও মনে হচ্ছে এই প্রথম পাহাড় দেখছি। যেদিকে চোখ যাচ্ছে যেন বিশাল সমুদ্রের মাঝে পাহাড়ের ঢেউ। এখানে ঘণ্টাখানেক ঘুরে বেড়ানোর পর ঠিক হলো আরো ভেতরে একটি এলাকা আছে কংলাক পাড়া; আমরা সেখানেও যাবো। পাহাড়কে আরো কাছ থেকে দেখার জন্য। রওনা দিলাম পায়ে হেঁটে। বিজিবি, আনসার ক্যাম্প পার হতেই একটি জিপ পেয়ে গেলাম, যেটি কংলাকের কাছাকাছি পর্যন্ত যাবে। পাহাড়ের যত গভীরে যাচ্ছি তত নতুন কিছু আবিষ্কার করছি। সবার চোখে মুখে কৌতূহল। কিছুদূর যাওয়ার পর স্থানীয় পাংখুয়াদের কমলার বাগান চোখে পড়ল। বাগানে তখন প্রচুর কমলাও ধরেছিল। জিপে আমাদের সাথে সহযাত্রী ছিল কয়েকজন ত্রিপুরা নারী, তাদর হাতে কিছু সব্জি ও নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যের ব্যাগ। আলাপ করে জানলাম, এগুলো তারা বাঘাইহাট বাজার থেকে কিনে এনেছে। আগামী এক সপ্তাহ এই অল্প খাবারেই তাদের পরিবারকে চলতে হবে। শুনে অবাক হলাম, বাজার করার জন্য মানুষ এত দূর যেতে পারে। মূলত ওসব পাহাড়ি এলাকায় মানুষের বেঁচে থাকাটাই একটা বড় চ্যালেঞ্জ। প্রতিবছর সাজেকের খাদ্য সংকটের যে খবর আমরা পাই, বাস্তবে সেখানকার অবস্থা আরো ভয়াবহ। সর্বশেষ গাড়ি থেকে নেমে কিছু দূর হাঁটার পর ত্রিপুরা নারীদের অনুসরণ করে একটা বিপদজনক পাথরের সিঁড়ি বেয়ে আমরা উঠে এলাম কংলাক পাড়ায়। যেখানে মেঘ আর রৌদ্র অবিরাম খেলা করছে।

এই গ্রামে মূলত পাংখুয়া ও ত্রিপুরা জনগোষ্ঠীর বসবাস। পাথরের ঢিবির উপর দাঁড়িয়ে আমরা নিজেদের নতুন করে বুঝতে শিখছি। বিশ্বাসই হচ্ছে না আমরা বাংলাদেশে দাঁড়িয়ে আছি। আকাশের মেঘ আমাদের কাছ দিয়ে ভেসে যাচ্ছে। কিছু দূর পর পর রৌদ্র-ছায়ার লুকোচুরি খেলা। কংকলাকের জীবনযাত্রা অত্যন্ত দুর্বিষহ। এরা নিয়মিত প্রকৃতির সাথে যুদ্ধ করে বেঁচে আছে। স্থানীয় মানুষেল মুখে শুনে অবাক হয়েছি, গোসল করা এবং খাবার পানি সংগ্রহের জন্য কংলাক পাড়ার মানুষকে দুইঘণ্টার পাহাড়ের কাছার বেয়ে নিচে নামতে হয় আর উঠতে হয়। আমাদের দেখে ছোট ছোট শিশুরা দৌড়ে কাছে এলো। কিছু পাবার আশায়। আমাদের সাথে নিয়ে যাওয়া কিছু চকলেট তাদের দিলাম। এসব পেয়ে শিশুগুলো চোখে মুখে কত যে আনন্দ, তা ভোলার মত নয়। এদের সাথে খেলতে খেলতে ও এবং ছবি তুলে কখন যে দুপুর ঘরিয়ে গেল টেরও পেলাম না। এবার ফেরার পালা। তার আগে আশপাশের বাড়িঘরগুলো ভালো করে দেখে নিবো। স্থানীয় পাংখুয়া গোষ্ঠীর লোকেরা সাধারণত খ্রিস্টান ধর্মের অনুসারী। তাদের ধর্ম পালোনের জন্য একটা গির্জাও চোখে পড়ল। সেদিন বড়দিন থাকায় ঘরে ঘরে কিছু আনুষ্ঠানিকতা চলছিল। সময় সল্পতার কারণে কংলাক পাড়ায় আর থাকা হয়নি। সন্ধ্যার আগেই ফিরতে হবে, তাই রওনা করলাম। পাহাড়ের বিভিন্ন এলাকায় ঘুরেছি, তবে সাজেকের একদিনের ভ্রমণ স্মৃতি স্মরণীয় হয়ে আছে। কর্মব্যস্ত জীবনে দুই একদিন অবসর পেলে আপনিও ঘুরে আসতে পারেন মেঘের বাড়ি সাজেক থেকে। কথা দিচ্ছি,  প্রকৃতির অপরূপ সৌন্দর্য্য দেখে কষ্ট আর খরচ পুষিয়ে যাবে।  

সাজেক কীভাবে যাবেন: ভৌগোলিক অবস্থানগত কারণে অনেকে সাজেককে খাগড়াছড়ি জেলার অংশ মনে করে। বাস্তবে সাজেক রাঙ্গামাটির জেলার বাঘাইছড়ি উপজেলার একটি ইউনিয়ন। তবে খাগড়াছড়ি থেকেই সাজেক ভ্রমণ করা সহজ। ঢাকা থেকে অথবা বাংলাদেশের যেকোন প্রান্ত থেকে প্রথমে খাগড়াছড়ি চলে আসুন। সেখান থেকে জিপ অথবা মোটরসাইকেলে করে দীঘিনালা হয়ে অল্প সময়ে সাজেকে চলে আসতে পারেন। কেউ ইচ্ছা করলে রাতে চাঁদের আলোতেও সাজেকের সৌন্দর্য্য উপভোগ করতে পারেন। এজন্য আপনাকে সাজেকে থাকার ব্যবস্থা করতে হবে। সেখানে রয়েছে বাংলাদেশ সেনাবাহিনী পরিচালিত কটেজ। এর জন্য আগেই যোগাযোগ করে বুকিং দিতে হবে। এজন্য www.rock-sajek.com এই ওয়েবসাইটের মাধ্যমে রুম বুকিং দিতে হবে। মোবাইলেও রুম বুকিং দিতে পারেন ০১৮৬২০১১৮৫২ এই নাম্বারে। এছাড়াও বেসরকারি কয়েকটি রিসোর্ট রয়েছে; সেখানেও বুকিং দিতে পারেন। রক প্যারাডাইস ০১৮৪২৩৮০২৩৪, মেঘ মাচাং ০১৮২২১৬৮৮৭৭। খাগড়াছড়ি শহরে রাত্রি যাপন করেও সাজেক দেখতে যেতে পারেন। খাগড়াছড়ি পর্যটন মোটেল ০৩৭১৬২০৮৪৮৫, হোটেল ইকোছড়ি ইন ০৩৭১৬২৬২৫, হোটেল শৈল সুবর্ণ ০৩৭১৬১৪৩৬, হোটেল জেরিন ০৩৭১৬১০৭১ এবং দীঘিনালা গেস্ট হাউজ ০১৮২৭৪৬৮৩৭৭। 

লেখক : সহকারী শিক্ষক, মাইনীমুখ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়।

No comments:

Post a Comment