শফিকুল ইসলাম::
১৯৮০-৮৭ সময়টুকু আমার কাছে অন্ধকারাচ্ছন্ন, খুব কম স্মৃতিই মনে পড়ে। শুধু গমের চালের ভাত আর দশ পয়সায় ১ কেজি মলা মাছ তখন আমাদের প্রধান খাদ্য ছিল। ১৯৮৭ সাল, তখন ৪র্থ শ্রেণিতে পড়ি। যে গ্রামে আমার বসবাস সেটি ছিল অপেক্ষাকৃত নিরাপদ। উপজাতিরা পাহাড় থেকে তাদের উৎপাদিত নানান ফলফলাদি বিক্রির জন্য গ্রামের উপর দিয়ে নিয়ে আসত। শিমুল আলু (কাঠ আলু), খিরা, মারফা ইত্যাদি। এর মধ্যে মারফা ফলটি বাঙালিদের নিকট ছিল নতুন। চলাফেরা এবং লেনদেনের মাধ্যমে বাঙালি এবং উপজাতিদের মধ্যে এক সময় সখ্য গড়ে উঠে। কিন্তু শান্তি বাহিনীর ভয় আকস্মিকভাবেই আমাদের এলাকার সেই শান্তিপূর্ণ পরিবেশের নিরবিচ্ছিন্নতাকে ধ্বংস করে দিল। শুরু হলো চারদিকে গুঞ্জন।
পাহাড় সংলগ্ন গ্রামের উঠতি বয়সের ছেলেদের মা-বাবারা আমাদের গ্রামটিকে নিরাপদ মনে করে সুর্য ডুবার আগেই ভাত খাইয়ে পাঠিয়ে দিত। আমাদের বাড়ির পশ্চিমের ক্ষেতে তৈরি করা হয়েছিল বিশালাকার একটি দাড়িয়া বান্দা খেলার ঘর। এক সাথে এক দলে ১১ জন করে খেলতে পারত সেখানে। প্রতিদিন চলত খেলা। মাঝে মাঝেই রব উঠত, ‘শান্তি বাহিনী’ আসছে। গুজব শুনে সতর্ক হয়ে উঠত সবাই। আশপাশের এলাকা তন্নতন্ন করে খোঁজ করা হতো, আসলেই শান্তি বাহিনী এসে কোথাও লুকিয়ে আছে কিনা দেখার জন্য। এক সময় ক্লান্ত হয়ে আমাদের বাড়ির পশ্চিমের কাচারি ঘরে কেউ চাটাই বিছিয়ে কেউবা আধা মাটিতে শুয়ে বিভোর ঘুম দিত।
আমাদের বাড়ির পূর্বদিকের গ্রামটির নাম রাজনগর। সত্যিই একদিন শান্তি বাহিনী এলো। হঠাৎ করে এসেই পুড়িয়ে দিল রাজনগর গ্রামটি। ১৯৮৬ সালের ৩ জুন দিবাগত রাতে শান্তি বাহিনী রাজনগর গ্রামে আক্রমণ করেছিল। সেদিন অবশ্য ওই গ্রাম থেকে আমাদের বাড়িতে কেউ আসেনি। নিরাপদ ভেবে প্রত্যেকে নিজের বাড়িতেই বিভোর ঘুমিয়ে ছিল। ফজরের আজান দিবে দিবে এমন সময় মা ঘুম থেকে জাগিয়ে শুধুু বলেছিল তাড়াতাড়ি চল, ‘শান্তি বাহিনী’ আসতেছে। চোখ কচলাতে কচলাতেই অন্ধকারে বন-জঙ্গল আর ডেবা ভেঙ্গে পশ্চিম দিকে পালাচ্ছিলাম। এক সময় বাবা বললেন, একটি গুলি নাকি বাবার কানের পাশ দিয়ে চলে গেছে। কানে একটু গরমও লেগেছে। ভাগ্যিস একটুর জন্য বাবা বেঁচে গেছেন।
ওইদিন রাজনগরের দুই শতাধিক বাড়ি আগুন দিয়ে পুড়িয়ে দিয়েছিল শান্তি বাহিনী। ওই গ্রামের ওমর আলীর পুরো পরিবারসহ সেদিন ১১ জন নিহত হয়েছিল শান্তি বাহিনীর গুলিতে। আমাদের জীবনের পরের দশটি বছর কেটেছে যাযাবরের মতো। তখন সপ্তম শ্রেণিতে পড়ি, ১৯৯১ সালের ২৩ জুলাই সহপাঠী সেলিম পড়ার খরচ জোগাড় করতে বাঁশ কাটতে গিয়ে সেসহ ৭ জন শান্তি বাহিনীর গুলিতে লাশ হয়ে ফিরে এসেছিল। এরপর ১৯৯৬ সালের ৯ সেপ্টেম্বর পাকুয়াখালীতে ৩৫ জন কাঠুরিয়াকে হত্যা করে শান্তি বাহিনী। এভাবে শান্তি বাহিনীর দ্বারা এই পার্বত্য জনপদ বারবার রক্তে রঞ্জিত হয়ে আসছে। প্রতিবাদের মুখে টনক নড়ে তৎকালীন ক্ষমতাশীনদের। ১৯৯৭ সালের ২ ডিসেম্বর সাক্ষর করা হলো শান্তিচুক্তি। বিলুপ্ত করা হলো ‘শান্তি বাহিনী’। আমরাও স্বপ্ন দেখলাম শান্তির জনপদের। কিন্তু আমাদের শান্তির স্বপ্ন দেখে ঘুম ভাঙ্গার আগেই সন্ত্রাস, চাঁদাবাজি, হত্যা, গুম ও মুক্তিপণ আদায় শুরু হলো এই জনপদে।
এখন শান্তি বাহিনী নেই, রয়েছে তাদেরই প্রেতাত্মারা। এই প্রেতাত্মাগুলোই সন্ত্রাস, চাঁদাবাজি, হত্যা, গুম ও মুক্তিপণ আদায়ে লিপ্ত। তাই এখন আর ঘুমিয়ে স্বপ্ন দেখে লাভ নেই, বরং প্রয়োজন শান্তি স্থাপনে কার্যকর উদ্যোগ। ‘স্বপ্ন সেটা নয় যেটা তুমি ঘুমিয়ে দেখ, স্বপ্ন হলো সেটাই যেটা পূরণের প্রত্যাশা তোমাকে ঘুমাতে দেয় না’ ভারতের সাবেক প্রেসিডেন্ট এপিজে আবদুল কালাম আজাদের এ বাক্যটির যথার্থতা দিতেই শুরু হলো আমাদের পথচলা। এই জনপদে প্রকৃত শান্তি প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে, জনগণের মধ্যে শিক্ষা বিস্তারের লক্ষ্যে শুরু হয়েছিল আমাদের নতুন উদ্যোগ। শুরু হলো প্রাক্তন ছাত্রছাত্রীদের পক্ষ থেকে কৃতি ছাত্রছাত্রীদের সংবর্ধনা দিয়ে এগিয়ে যাওয়ার উৎসাহ দেওয়া। আমাদের সেই ছোট্ট প্রয়াসটি আজকের ‘ফরমার অ্যাসোসিয়েশন অব গুলশাখালী’। যার পক্ষ থেকে কৃতি ছাত্রছাত্রীদের সংবর্ধনার মাধ্যমে উৎসাহ, উদ্দীপনা দিয়ে প্রকৃত শিক্ষায় শিক্ষিত হয়ে শান্তিকামী নাগরিক হওয়ার স্বপ্ন দেখানো হয়। এই পার্বত্য জনপদকে হায়েনার কবল থেকে মুক্ত করে শান্তির স্বপ্ন বাস্তবায়নে প্রজন্ম থেকে প্রজন্মের নিকট স্বপ্ন দেখার প্রয়াস হিসেবে অব্যাহত থাকুক আমাদের এই প্রচেষ্টাটি।
শফিকুল ইসলাম: সাধারণ সম্পাদক, স্থায়ী কমিটি, ফরমার অ্যাসোসিয়েশন অব গুলশাখালী।

No comments:
Post a Comment