খায়রুন নাহার সুইটি::
আমি তখন দ্বিতীয় বর্ষে পড়ি, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে। ক্যাম্পাসে দু’টি রক্তদান সংগঠনের মধ্যে ‘স্বজন’ একটি। স্বেচ্ছায় রক্তদানের বিষয়টি আমার আগে থেকেই খুব ভালো লাগতো। আমার রক্তে নতুন করে একটি মানুষ বেঁচে উঠবে এটা ভাবলেই অন্যরকম তৃপ্তি পেতাম। তাই আগ্রহবশত একদিন স্বজনের সদস্য হয়ে যাই। অতঃপর, কিছুদিন পরই রক্তদানের জন্য ‘স্বজন’ থেকে ডাক আসে।
প্রথমবার খুব কাছের বান্ধবী মৌসুমীকে জানাই যে, আমি রক্তদান করতে চাচ্ছি। সে তো শোনামাত্রই রেগেমেগে আগুন। টানা কয়েকমিনিট বকাঝকা দিলো। ফোনটা হাতে নিয়ে ভাবতে লাগলাম কী করা যায়। কিছুক্ষণ ভেবে মাকে ফোন দিলাম, বিষয়টা জানাতে। এবারেও একই ঘটনার পুনরাবৃত্তি। দু’জনের রাগারাগির পেছনে কিছু যুক্তিও ছিল।
আমার ওজন তখন ৫০/৫১ কেজি। রক্তদানের জন্য যথেষ্ঠ। কিন্তু আপনজনদের কাছে আমি চিরকালই ওজনহীন সরল দোলক। শারীরিক দিক থেকে আমি একটু দুর্বলও বটে। দ্বিতীয় কথা হচ্ছে কয়েকদিন পরই ডিপার্টমেন্ট থেকে ফিল্ডওয়ার্ক করতে কাপ্তাই যাওয়ার কথা ছিল। ফিল্ডে কঠোর পরিশ্রম করতে হয় আমাদের। অতএব, এখন রক্ত দেওয়া যাবে না কিছুতেই।
পরেরবার ‘স্বজন’ থেকে আবার রক্ত চাইল। অসুস্থ থাকার কারণে সেবারেও সম্ভব হয়নি। তার কিছুদিন পর আবার যখন রক্তদানের ডাক আসে আমি আর এ সুযোগ হারাতে চাইনি। তাই কাউকে না জানিয়ে এক স্বজনকর্মীর সাথে চলে যাই রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে। কাগজে স্বাক্ষর করে অপেক্ষা করতে থাকি কখন আমার রক্ত নেওয়া হবে। ভেতরে তখন অন্যরকম অনুভূতি তৈরি হতে থাকে। আমার রক্তে বেঁচে উঠবে একটি প্রাণ, একটি শিশু। ভাবতে অসম্ভব ভালো লাগছিল। ছোটবেলা থেকে আমি খুব সাহসী তাই মোটেই ভয় পাচ্ছিলাম না। বরঞ্চ আমার খুব আনন্দ হচ্ছিল তখন।
মানুষকে বাঁচানোর প্রয়াস জাগছিল মনে। যদিও সবকিছুর মালিক আল্লাহ, আমরা কেবল উছিলা মাত্র। একসময় ডাক পড়ল এবং ভেতরে গেলাম। লম্বা উঁচু টেবিলে শুইয়ে আমার হাতে সুঁচ ফুটানো হলো। প্রথমে ডান হাতে চেষ্টা করল, কিন্তু ধমনী পাচ্ছিল না কোথাও। অতঃপর, বাম হাত থেকে রক্ত নেওয়া হলো। আমার তেমন কোনো কষ্টই হয়নি। মনে প্রশান্তি ছিল বলেই ব্যথা লাগেনি হয়ত। এক ব্যাগ রক্ত নেওয়ার পর আমাকে জুস খেতে দেয়া হয়। রক্ত নেওয়ার আগে এক বোতল ঠাণ্ডা পানি খাওয়ানো হয়েছিল আমাকে। কারণ রক্তের ঘাটতি পূরণ করতে এসময়ে পানিটা খুব জরুরি। কিছুক্ষণ বিশ্রাম নেওয়ার পর বেরিয়ে আসলাম সেখান থেকে। সাথে ছিল স্বজনকর্মী হুমায়ন।
বারান্দায় এসে দাঁড়াতেই ধপাস...। মাথার ভেতর ভোঁ ভোঁ শব্দ হচ্ছিল আর প্রচন্ড যান্ত্রিক শব্দ শুনতে পাচ্ছিলাম। কিছুক্ষণ পর চোখ মেলেই অনেকগুলো অপরিচিত মুখ দেখতে পাই। তারা চারিদিক থেকে ঘিরে আছে। একটু পর হুমায়নের সাহায্য নিয়ে উঠে দাঁড়াই। আমাকে ভিতরে নিয়ে একটি বিছানায় শোয়ানো হয়। আমার অবস্থা দেখে ছেলেটা খুব উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েছিল। কারণ আমাকে সুস্থ করার সকল দায়িত্ব এখন তার। আমি তাকে অভয় দেই এবং কিছুক্ষণ পর সম্পূর্ণ সুস্থ হয়ে উঠে বসি। সকল ক্লান্তি এবং দুর্বলতা ঝেড়ে ফেলে উঠে দাঁড়াই এবং বাইরে বেরিয়ে আসি।
তখন অসাধারণ ভালোলাগা কাজ করছিল ভেতরে। জীবনের শ্রেষ্ঠ সুখের অনুভূতিগুলোর মধ্যে এটি ছিল একটি। মনে হচ্ছিল, মানুষ হিসেবে আমার খুব বড় একটি দায়িত্ব ছিল এবং সেটি আমি পালন করেছি পরম আনন্দে। এরপর আরও দু’বার রক্তদানের ডাক আসে এবং প্রচন্ড আগ্রহ নিয়েই রক্তদান করেছি। সিদ্ধান্ত নিয়েছি যে, প্রতি ছয় মাস পরপর আমি রক্তদান করবো এবং বছরে দু’টি করে প্রাণকে দান করবো নতুন স্পন্দন। আল্লাহ যেন আমাকে সেই সুযোগ দান করেন।
খায়রুন নাহার সুইটি : তৃতীয় বর্ষ, ভূতত্ত্ব ও খনিবিদ্যা বিভাগ, রাজশাহী বিশ^বিদ্যালয়।


No comments:
Post a Comment